অনুপ্রেরণা – ১

“যে মানুষটাকে ভালোবাসি, তাকে আমাদের অবশ্যই বুঝতে হবে। আমাদের ভালোবাসা যদি হয় কেবল কাউকে দখল করে রাখার কোন চাওয়া, তাহলে তা ভালোবাসা নয়। আমরা যদি শুধু আমাদেরকে নিয়ে চিন্তা করি, শুধু আমাদের প্রয়োজনগুলোই বুঝি এবং অন্যদের প্রয়োজনকে এড়িয়ে যাই, তাহলে আমরা কখনই ভালোবাসতে পারবো না। যাদের ভালোবাসি তাদের প্রয়োজন, চাওয়া, ভালোলাগা এবং কষ্টগুলো আমাদেরকে অবশ্যই গভীরভাবে খেয়াল করতে। এটাই প্রকৃত ভালোবাসার পথ। আপনি যখন কাউকে সত্যিকার অর্থে বুঝতে পারবেন, তখন তাকে ক্রমাগত ভালোবেসে যাওয়া থেকে আপনি নিজেকে ঠেকাতে পারবেন না।” [গ্রন্থ : Peace Is Every Step: The Path of Mindfulness in Everyday Life]

* * *
“আপনাকে যারা ভালোবাসে তারা আপনার করা ভুলগুলো অথবা আপনার বাজে স্মৃতিগুলোকে মনে রাখার বোকামি করবে না। আপনাকে যখন দেখতে খারাপ লাগে তখন তারা আপনার সৌন্দর্যকে স্মরণ রাখে, আপনি যখন ভেঙ্গে পড়েন তখন আপনার পূর্ণতার সময়গুলোকে মনে রাখে, আপনি যখন অপরাধবোধে ভুগেন তখন আপনার সরলতাকে খেয়ালে রাখে এবং আপনি যখন দ্বিধায় থাকেন তখন আপনার উদ্দেশ্যকে মনে রাখে। [অ্যালান কোহেনের উদ্ধৃতির ভাবানুবাদ]

* * *
জীবনের যেসব বিষয় নিয়ে হিসাব-নিকাশ মেলেনি, সেগুলোর ব্যাপারে ধৈর্য ধরুন। সেই উত্তর-না-পাওয়া প্রশ্নগুলোকেই ভালোবাসতে চেষ্টা করুন, যেমন করে আপনি গ্রহণ করে থাকেন বন্ধ দরজার একটি ঘর অথবা ভিনদেশি ভাষায় লেখা কোন একটা বই। এখনই সব উত্তর খুঁজতে ব্যস্ত হবেন না। আপনাকে সেই প্রশ্নগুলোর উত্তর এখন দেয়া হবে না কেননা সেসব জেনে আপনি ঠিকভাবে বাঁচতে পারবেন না। তাছাড়া, এই বিষয়গুলো হলো অভিজ্ঞতার পথ দিয়ে যাওয়া। জীবনের এই দিনগুলোতে আপনার এই প্রশ্নগুলো বুকে নিয়েই বাঁচতে হবে। হয়ত, সময়ের সাথে কোন একদিন, আপনি নিজের অজান্তেই ধীরে ধীরে প্রশ্নগুলোর উত্তর জেনে যাবেন। [রেইনার রিলকার ‘Letters To A Young Poet’ থেকে উদ্ধৃত অংশের ভাবানুবাদ]

* * *
যারা আপনাকে সাধারণ কিছু স্নিগ্ধ ও শান্ত কথা বলে একটুখানি স্বস্তি এনে দিতে চেষ্টা করেন, তাদের দেখে  এমনটা ভেবে বসবেন না যে তাদের জীবনটা যন্ত্রণাবিহীন। তার জীবনেও দুঃখ-কষ্ট এবং যন্ত্রণা থাকতে পারে যা হয়ত আপনার চাইতেও বেশি। যদি তেমনটা না-ই হতো, তাহলে তিনি এমন কিছু শব্দ কখনো খুঁজে পেতেন না।
~ রেইনার রিলকা [অস্ট্রিয়ান ঔপন্যাসিক, ১৮৭৫-১৯২৬]

* * *
“চারপাশে অনেক ঘৃণার মাঝে আমি আমার ভেতরে এক অপরাজেয় ভালোবাসাকে খুঁজে পেয়েছি। অনেক অশ্রুধারার মাঝে আমি নিজের ভেতরে এক প্রশান্তিকে খুঁজে পেয়েছি। তীব্র শীতের মাঝে আমি খুঁজে পেয়েছি আমার ভেতরে এক অপরাজেয় গ্রীষ্মকাল ছিলো, যা আমাকে সুখী করেছে। এগুলো উপলব্ধি আমাকে মনে করিয়ে দিয়েছে, এই পৃথিবী আমাকে যতই চাপ দিয়ে পিষ্ট করতে চেষ্টা করুক না কেন, আমার ভেতরে তার চেয়ে শক্তিশালী কিছু রয়েছে যা সেই তাকে আপন শক্তিতে ফিরিয়ে দিচ্ছে।” [আলবার্ট কামুসের উদ্ধৃতি অনুসরণে]

* * *
আপনি যেমন ঠিক তেমন করেই আরেকজনকে ভালোবাসতে দিন — থাকুক না আপনার খুঁতগুলো, কিংবা নিজেকে অনাকর্ষণীয় মনে হওয়া কিংবা নিজেকে অসম্পূর্ণ মনে করা। হয়ত ভেবেছেন নিখুঁত হতে পারেননি বলে হয়ত আপনাকে কেউ ভালোবাসতে পারবে না, আর সেই কারণে আপনার খুঁতগুলোকে অবশ্যই ঢেকে রাখতে হবে। এমন বিশ্বাসের সাথে তো তুলনা চলে সেই বিশ্বাসের যাতে মনে করা হয় সূর্যের আলো এসে ভাঙ্গা জানালা দিয়ে ঘরে ঢুকে অন্ধকার ঘরকে আলোকিত করতে পারবে না। [মার্ক হ্যাকের উদ্ধৃতির অবলম্বনে]

* * *
অসাধারণ আর চমৎকার মানুষ হিসেবে আমরা তাদেরকেই পাই যারা জীবনে পরাজিত হয়েছেন, দুঃখ-কষ্টে ভুগেছেন, জীবনযুদ্ধে ধুঁকেছেন, অনেক কিছু হারিয়েছেন; যারা শত কষ্ট ও প্রতিবন্ধকতায় জীবনকে গভীর থেকে উপলব্ধি করেছেন। তাদের থাকে জীবনের প্রতি ভালোবাসা, স্পর্শকাতরতা, থাকে গভীর জীবনবোধ, ভাঙ্গাকে গড়ে নেয়ার প্রতি আর্তি যা তাদেরকে সহানুভূতিশীল, বিনয়ী, নম্র, দয়ার্দ্র এবং অন্যের কষ্টের ব্যাপারে সচেতন করে তোলে। অসাধারণ আর সুন্দর মানুষেরা আপনা আপনিই তৈরি হয়ে যায় না। [Elisabeth Kubler-Ross-এর উদ্ধৃতির আলোকে]

* * *
“কখনো ব্যর্থ না হবার মাঝে নয়, বরং প্রতিটি ব্যর্থতার পরে উঠে দাঁড়ানোর মাঝেই আমাদের গৌরব লুকিয়ে থাকে।”~ কনফুসিয়াস

* * *
“চিন্তাগুলোর ব্যাপারে সচেতন হোন, আপনার চিন্তা মুখের কথায় পরিণত হয়,
মুখের কথার ব্যাপারে সচেতন হোন, আপনার কথা কাজে পরিণত হয়,
কাজগুলোর ব্যাপারে সচেতন হোন, আপনার কাজ স্বভাবে পরিণত হয়,
স্বভাবের ব্যাপারে সচেতন হোন, আপনার স্বভাব চরিত্রে পরিণত হয়,
চরিত্রের ব্যাপারে সচেতন হোন, কেননা তা আপনার ভবিষ্যত নির্ধারণ করে দেবে।”
~  লাও যু, প্রাচীন চৈনিক দার্শনিক [খ্রিষ্টপূর্ব ৬ষ্ঠ শতক]

* * *
“যারা কথা বলে তারা জানে না, যারা জানে তারা কথা বলে না।”~ প্রাচীন চৈনিক দার্শনিক লাও-যু

* * *
“চরিত্র গড়েই উঠে পছন্দ থেকে। দিনের পর দিন, আপনি যা পছন্দ করেন,চিন্তা করেন এবং যেঁ কাজগুলো করেন  — তা আপনাকে গড়তে থাকে, একদিন তা ‘আপনি’তে পরিণত হয়।” ~ হেরাক্লিটাস

* * *
“আমি যখন জীবনের পেছনে ফিরে তাকাই, আমি উপলব্ধি করি যতবার ভেবেছিলাম আমি কোন ভালো কিছুর প্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত হচ্ছি, আমাকে আসলে আরো বেশি ভালো কিছুর দিকে ঘুরিয়ে দেয়া হচ্ছিলো। ~স্টিভ মারাবোলি

* * *
এমন এক ভালোবাসাতে বিশ্বাস করুন যা আপনার জন্য জমা আছে যেমন থাকে উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া সম্পদ। দৃঢ় বিশ্বাস রাখুন সেই ভালোবাসার মাঝে এমন সুবিশাল শক্তি আর আশীর্বাদ আছে যার মাঝে আপনি যত ইচ্ছা তত ঘুরে বেড়াতে পারবেন এবং সেই ভালোবাসার বৃত্ত থেকে বাইরে পা দেয়ার দরকারই আপনার হবে না। [রেইনার মারিয়া রিলকার উদ্ধৃতি অনুসরণে]

আপনার বর্তমান অবস্থানের কারণে গর্ববোধ করবেন না

“পৃথিবীর ক্ষমতাশালী রাজাদের প্রত্যেকেই একসময় কান্নাকাটি করা একটা শিশু ছিলো, প্রতিটি বিশালাকার ভবন একসময় ছিলো কেবলই একটি নকশা। আপনি আজকে কী, সেটা খুব বেশি গুরুত্বপুর্ণ বিষয় নয়; সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ হলো আগামীকাল আপনি কোথায় থাকবেন। কখনো, কোনভাবেই আপনার বর্তমান অবস্থানের কারণে গর্ববোধ করবেন না। ভেবে দেখুন, দাবা খেলা শেষ হবার পরে রাজাকেও কিন্তু সৈন্যের সাথে একই বাক্সে যেতে হয়।”

আল্লাহ যেন পৃথিবী থেকে আমাদের বিদায়ের পরে জান্নাতের বাগানসমূহের একটি বাগানে স্থান করে দেন এবং জাহান্নামের আগুনে দগ্ধ হবার হাত থেকে আমাদেরকে রক্ষা করেন।

[সংগৃহীত; ইংরেজি থেকে অনুবাদকৃত]

আমাদের মনের জানালা দিয়ে দেখা

একটা গল্প, কিছু কথা, বলে দেয় অনেক কিছুই…
…..

নববিবাহিত দম্পতি নতুন বাসা নিয়েছে। পরদিন সকালে তারা যখন নাশতা করছিলো, মেয়েটি জানালা দিয়ে পাশের বাড়ির দিকে তাকিয়ে দেখতে পেলো কাপড় শুকাতে দিয়েছে ঘরের কর্ত্রী। সে বলে উঠলো,
– ‘কাপড়টা পরিষ্কার হয়নি, ঐ বাসার মহিলা ভালো করে কাপড় ধুতে জানেনা। তার মনে হয় ভালো কোন কাপড় কাচার সাবান দরকার।” মেয়েটির স্বামী সেদিকে তাকালো, কিন্তু নিশ্চুপ রইলো।

যতবারই পাশের বাড়ির মহিলাটি কাপড় শুকাতে দিতো, ততবারই এই মেয়েটি একই মন্তব্য করতো।

মাসখানেক পরে সেই বাড়িতে সুন্দর পরিষ্কার কাপড় শুকানোর জন্য ঝুলতে দেখে মেয়েটি অবাক হয়ে তার স্বামীকে বললো,”দেখো, অবশেষে উনি শিখেছেন কীভাবে ঠিকভাবে কাপড় ধুতে হয়। আমি তো ভাবছি কে তাকে শেখালো!!”
তখন ছেলেটি বলে উঠলো, “শোনো, আজ ভোরে আমি আমাদের জানালার কাঁচ পরিষ্কার করেছি!”

…..

আমাদের জীবনটাও এমনই —

“আমরা কোন কিছু দেখার সময় যা দেখি তা নির্ভর করে আমাদের সেই জানালার পরিচ্ছন্নতার উপর যা দিয়ে আমরা দেখি। কোন সমালোচনা করার আগে আমাদের নিজের মনের অবস্থাটা খেয়াল করে নেয়া প্রয়োজন, নিজেদেরকে প্রশ্ন করা দরকার যে আমরা কি তার মাঝে কোন ভালো দেখতে চাই আদৌ? নাকি মানুষটার দিকে তাকাচ্ছি তার ভুলগুলো খুঁজে পেতে বিচার করবো বলেই।”

সবাই তো পড়লাম… আসুন তা নিজেদেরকে স্মরণ করিয়ে দিই।

[শাইখ যাহির মাহমুদের ফেসবুক পেইজের পোস্ট থেকে ভাষান্তর]

যদি কিছু ভালো না লাগে, অস্থির লাগে তাহলে কিছু আইডিয়া

কিছু কিছু সময় আছে যখন ‘কেন যেন ভালো লাগতেসেনা’ টাইপের ফিলিং হয়। বয়ঃসন্ধিকালে যখন এরকম হতো, তখন বইপত্র ঘেঁটে এইটার কারণ উদঘাটন করতে গিয়ে পড়ে নিজেকে বুঝ দিয়েছিলাম যে এখন আসলে শরীর-মনে পরিবর্তন আসছে তাই একটু মন খারাপ/উদাস হতেই পারে। সমস্যা সমাধান হয়নি, বরং সময়ের সাথে সাথে প্রকট হয়েছিলো। ভার্সিটি লাইফে উপলব্ধি করলাম হল জীবনটা হলো সুতোকাটা ঘুড়ির মতন, এখানে ‘কী যেন নেই’ অনুভূতি আরো বেড়ে গিয়েছিলো। আশেপাশে সবাইকে দেখে টের পেতাম, এরকম অনুভূতিকে খুব কম ছেলেই আলাদা ধরতে পারত, কিন্তু পালিয়ে বাঁচতে তাস খেলা, কম্পিউটার গেমস, মুভি দেখা টাইপের অর্থহীন সময় নষ্টের কাজের মাঝেই ‘এন্টারটেইনমেন্ট’ খুঁজে নিতো, কিন্তু কখনই অন্তরের শূণ্যতা দূর করতে পারত না কেউ। মনের সাথে সামনে দাঁড়িয়ে বোঝাপড়া করার সাহসটাই বেশিরভাগ মানুষের থাকে না, মনকে তখন ‘চিন্তা এড়িয়ে’ যেতে দেয় সবাই। সমস্যার সমাধান তখন আর হয়না ।

সমাধান নিয়ে ভেবেছিলাম তখনো। ইদানিং বেশ কিছু আলোচনা আর বই আল্লাহ সামনে এনে দিয়েছেন যা থেকে শিখছি, মূল সমাধান আসলে খুবই সরল — জীবনের কেন্দ্রে আল্লাহকে নিয়ে আসা, প্রতিটা কাজেই আল্লাহর সন্তুষ্টি খোঁজা। যখন ছোট ছোট কাজেও আমরা আল্লাহর সাহায্য চাই এবং তা করে আল্লাহকে খুশি করতে চাই তখন তা সহজ করে দেন আল্লাহ। কিন্তু সমস্যা হলো, আমরা সবসময় চাইনা, ভুলে যাই বা বিষয়টিতে আনন্দ পাইনা বলে আগ্রহ একরকম থাকে না সবসময়। আমাদের মন খুবই পরিবর্তনশীল, দু’আ করা উচিত — ‘ইয়া মুক্বাল্লিবাল কুলুব, সাব্বিত কুলুবানা ‘আলা দ্বীনিক’।

আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনকে কেন্দ্রে রেখে জীবনের কাজগুলো করতে চাইলে কিছু চেষ্টা করতে হবে। প্রথমত, জানা দরকার যে এমনটা হবেই, দুনিয়াতে অন্তর কখনো পূর্ণ হবেনা, শূণ্যতা থাকবেই। কেবলমাত্র যেদিন আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার সাক্ষাত লাভ করবে রূহ, সেদিন আমরা প্রশান্ত হব, শান্তি পাবো। দ্বিতীয়ত, অন্তরকে সঠিক পথে ধরে রাখতে কিছু ছোট ছোট কাজ করা যেতে পারে —

# অনর্থক কথা বলা, অন্যের গীবত করায় কোন কল্যাণ নেই। এইসব কথাবার্তা এড়িয়ে চলা উচিত। কল্যাণকর কথা বলা, সম্ভব হলে জ্ঞানী ও দ্বীনি বন্ধু/ভাইদের সান্নিধ্য খোঁজা। না থাকলে নির্জনতায় জ্ঞানার্জনের জন্য বইকে সঙ্গী করার চেষ্টা করা।

# সবসময় অযুর মধ্যে থাকা। একবার অযু ভেঙ্গে গেলে, আবার অযু করা। এতে পবিত্র ভাব থাকে, শরীর-মন চনমনে থাকে, ইবাদাতের প্রতি একটা স্বতঃস্ফূর্ত আকাঙ্ক্ষা আসে।

# সুন্দর, পরিচ্ছন্ন পোশাক পরা, নিজেকেও পরিপাটি করে রাখা। নিজের ‘ড্রেস-আপ এবং টার্ন-আউট’ অনেক প্রভাব ফেলে মানসিকতায়।

# গান না শোনাঃ একজন দ্বীনদার মুসলিম বাদ্যযন্ত্র সহকারে তৈরি হওয়া প্রচলিত নষ্টধারার গান শুনবে না এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু তবুও কখনো এরকম ভুল যেন না হয়। গানের কথাগুলো বেশিরভাগেই প্রেম-বিরহ এবং শিরক বিষয়ে হয়ে থাকে, যা শুনলেও তা পথভ্রষ্ট করে উদাস করবে, নইলে মনকে সুরের মূর্ছনায় নিয়ে মনকে শূণ্যতা থেকে ক্ষতিগ্রস্ত হবার মত কোন পথে নিয়ে যাবে, ইবাদাতের প্রতি ভালোবাসাকে কমিয়ে ফেলবে।

# কুরআন তিলাওয়াত করাঃ কুরআন তিলাওয়াত করা অন্তরকে প্রশান্ত করে। যেকোন অশান্তিকে দূর করে। জীবনের প্রকৃত লক্ষ্যকে স্মরণ করিয়ে দেয়। আল্লাহর গ্রন্থের এই এক অসাধারণ গুণ, সুবহানাল্লাহ!

# সলাত আদায় করাঃ দুই রাকা’আত সলাত আদায় করলেও মন প্রশান্ত ও কেন্দ্রীভূত হয়ে যাবার কথা। নামাযের সিজদার সময় বান্দা আল্লাহর সবচাইতে নিকটবর্তী হয়। এই সময়টা পেলে অন্তরও প্রশান্ত হবেই ইনশাআল্লাহ। মুসলিম হিসেবে সলাত আমাদের জন্য চক্ষুশীতল করা শান্তি এনে দেবে — এটা তো আমাদের ঐতিহ্য।

♥ সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ, মনে রাখতে হবে কোন অবস্থাতেই বিষণ্ণতাকে প্রশ্রয় দেয়া যাবে না। মনটাকে সবসময় কাজ দিতে হবে। ভালো লাগা পছন্দের কাজে (যা কল্যাণকর) যত ছোটই হোক তা করা উচিত, এতে মন প্রফুল্ল থাকে। যেকোন নেতিবাচক চিন্তা আমাদের সৃষ্টিশীলতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে, সম্ভাবনাকে নষ্ট করে, ঈমানকেও ক্ষতিগ্রস্ত করে। ইতিবাচক চিন্তা করতে হবে, সম্ভাবনা নিয়ে ভাবতা হবে। বিভিন্ন বিষয় থেকে ভালো খুঁজে নিতে হবে, মন্দটুকু নিয়ে চিন্তা ও আলাপ করা ক্ষতি ছাড়া আর কিছুই বয়ে আনে না। ♥

আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা যেন আমাদেরকে প্রচেষ্টাগুলোকে কবুল করেন, আমাদেরকে ‘নাফসুল মুতমাইন্নাহ’ বা প্রশান্ত আত্মাকে ধারণ করার তাওফিক দেন এবং আমাদেরকে জান্নাতুল ফিরদাউসের পথে পরিচালিত করেন। আমিন।


রেফারেন্স

# লা তাহযান, হতাশ হবেন না – ড আইদ আল কারনি (peace পাবলিকেশন্স, মূল্য ২৪০ টাকা, প্রাপ্তিস্থান: কাঁটাবন মসজিদ কমপ্লেক্স)
# ভিডিও লেকচার : শাইখ হামজা ইউসুফ

আল্লাহর উপরে আস্থা আমরা কেন রাখি? কীভাবে রাখি?

গভীর কষ্ট, যন্ত্রণা আর চাপের মাঝেও আমাদের সেই মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার উপরেই আস্থা রাখা উচিত যিনি মুসা আলাইহিস সালামের সামনের লোহিত সাগরকে ভাগ করে পথ তৈরি করে দিয়েছিলেন, যিনি ইবরাহিম আলাইহিস সালামকে দগ্ধ করতে চাওয়া অগ্নিকুন্ডকে শান্তিময় শীতল করে দিয়েছিলেন, যিনি বদরের প্রান্তরের মানুষগুলোকে জয়ী করতে ফেরেশতাদের পাঠিয়েছিলেন, যিনি বৃদ্ধ বয়সে জাকারিয়া আলাইহিস সালামকে দান করেছিলেন ইয়াহইয়া (আ) এর মতন সন্তান, যিনি বৃদ্ধ ইবরাহিম আলাইহিস সালামকে দান করেছিলেন ইসমাইল ও ইসহাক দু’জন নাবী (আলাইহিমুস সালাম)। আল্লাহর নির্দেশেই শিশু ইসমাইলের পায়ের আঘাতে তৈরি হয়েছিলো আমাদের বিষ্ময় ও রাহমাতপূর্ণ যমযম কূপ, খটখটে রৌদ্রে তৈরি করা নূহ আলাইহিস সালামের কিশতিকেও তিনিই ভাসিয়েছিলেন পাহাড় ডুবে যাওয়া পানির প্রবাহে।

আমাদের কাছে যা অসম্ভব, সেটা তার কাছে কোন ব্যাপারই না, কারণ তিনিই সৃষ্টিকর্তা। তিনি তাদেরকেই সাহায্য করেন যিনি তার উপরে বিশ্বাস রাখে, আস্থা রাখে। এই আস্থা কোন ‘terms and conditions’ দিয়ে তৈরি হওয়া না, এই আস্থা আমাদের পরম আস্থা। হৃদয়ের সমস্ত ভালোবাসা, বিশ্বাস, আস্থা, নির্ভরতা কেবল তার উপরে সঁপে দিয়েই আমরা নির্ভার হই। আমাদের মালিক আমাদেরকে যখন ইচ্ছা তখন দান করেন, আমাদের জীবনের ও অস্তিত্বের প্রতিটি জিনিসই তার দান। এই দান আরো বাড়বে, আমরা যতই শুকরিয়া করব, যতই পাগলের মতন চাইবো। আল্লাহ যখন দান করেন, কীভাবে দান করেন, কোথা থেকে আসে তা বোঝার যোগ্যতা মানুষের হয়না, সেই শক্তি ও ক্ষমতা ক্ষুদ্র মানুষের নেই। নিশ্চয়ই আল্লাহ পরম শক্তিশালী, সর্বজ্ঞানী, ইবাদাতের যোগ্য একমাত্র সত্ত্বা। সমস্ত প্রশংসা কেবলই আল্লাহর যিনি রাহমান, যিনি রাহীম। আল্লাহ আমাদেরকে তার প্রতি সবসময়, প্রতিক্ষণে, প্রতিমূহুর্তে প্রশান্তচিত্তে কৃতজ্ঞ থাকার তাওফিক দিন।

[১৭ এপ্রিল, ২০১]

কোন কিছু কি সহজ? আমরা কি কিছু করতে পারি?

কোন কিছু কি সহজ? আমরা কি কিছু করতে পারি? সবকিছুই তো কঠিন, যতক্ষণ না তিনি তা সহজ করে দেন, যতক্ষণ না তিনি আমার চারপাশকে একটা কাজের জন্য তৈরি করে দেন। আশেপাশের কতজন কী ভীষণ বদলে গেলো, সুন্দর থেকে সুন্দর মন-প্রাণের হয়ে গেলো। কেউ কেউ এত খারাপ হয়ে গেলো, সেই খারাপ কাজে মরেও গেলো। প্রায়ই ঘোরের মতন লাগে। এইতো সেদিন ছিলাম একসাথেই, একই আড্ডায়। আজ ছেলেগুলো নেই, আর কোনদিন পৃথিবীতে আসবে না। আমার নিজেরও অফিসে বের হবার সময় প্রায় প্রতিদিন সিঁড়ি বেয়ে নামার সময় মনে হয়, আজ কি বাসায় ফিরতে পারব দিনশেষে? আমরা তো ভীষণ দুর্বল সৃষ্টি। আমার দুর্বলতা আমি টের পেয়েছি যখন জ্বরে বিছানায় শুয়ে ঘোরে চলে গিয়েছি। অথবা অপারেশন থিয়েটারে ডাক্তারের সুঁই আর চাকুর নিচে গিয়ে মনে হয়েছিলো, আমার বিভ্রমের জীবনের সমাপ্তি কি তেমন কঠিন কিছু? যাদের চারপাশে বেঁধে রাখতাম, জুড়ে থাকতাম — সবাই তো দূরেরই।

কতই তো বদলে যেতে চাইলাম, কতখানিই বা পারি? তবে পরম আরাধ্য যা থাকে, তিনি সেই জিনিসগুলো সহজ করে দিতে থাকেন। পথপানে এগিয়ে গেলে সামনের পথ আলোকিত হয়ে দৃষ্টিসীমায় পথ প্রসারিত হতে থাকে। এই চাওয়া কতজনের কতরকম! যে যেমন জিনিসে মুগ্ধ হয়, ভালোবাসা কাজ করে যেদিকে, সে সেদিকেই ধাবমান হয়। ক্রমে তার প্রাপ্তিগুলোও ঐ কেন্দ্রিকই হয়। দুনিয়াতে ডুবে গেলে যাওয়াই হয়। আখিরাতের পথে কিছু চাইলে চাওয়ার গভীরতার উপরে হয়ত নির্ভর করে অর্জনের তীব্রতাও। তখন পথচলায় অনুভূতির জগতে কষ্টগুলোও হয়ত হালকা হয়ে যায়। সেটা তিনিই করে দেন। তিনিই তো সবকিছুর মালিক, যাকে ইচ্ছা দেন, যাকে ইচ্ছা বঞ্চিত করে কেড়ে নেন। মাঝে মাঝে দু’চোখে দেখে অসম্ভব লাগে আমার, আমি মুগ্ধ চোখে হয়ে বদলে যাওয়া অসাধারণ মানুষদের দেখি, হৃদয়ে নাড়া খাই। শুধু মনে হয়, এই পথযাত্রায় হয়ত থেমেই আছি, তবু তা হয়ত বসে থাকার চাইতে ভালো, জানিনা আমি। তিনি চাইলে সহজ হবে অনেক কিছুই, তার অপার রাহমাতের অপেক্ষাতেই রই। ফিরে তো যাব তার কাছেই, এসেছিলাম তার কাছ থেকেই। শাইখ হামজা ইউসুফের কথাটা স্মরণ হয়ে গেলো —

“আপনি যখন দরজায় দাঁড়িয়ে কড়া নাড়ছেন, তখন সেই কাজটিও দরজা খুলে যাওয়ার একটি অংশ; আপনি যখন কোন যাত্রাপথে তখন রওয়ানা হওয়ার মাঝেই আপনার যাত্রা শুরু হয়ে গেছে, যদি কাঙ্খিত লক্ষ্যে পৌঁছতে না-ও পারেন তবু চিন্তিত হবেন না। সময় নষ্ট করা বন্ধ করুন, মৃত্যু আপনার জন্য অপেক্ষা করছে। এটাই ছিলো ইমাম গাজ্জালীর মূল বার্তা।”

১০ এপ্রিল, ১৩

হামিংবার্ড ও আমরা

একটা বনে আগুন লেগেছে। সমস্ত বন তোলপাড়, সব প্রাণিরা এসে ভীড় করেছে আগুণের চারপাশে। সবাই হা-হুতাশ করছে এখন কী হবে ভেবে। সেই বনের পাশে একটা খাল ছিলো। বনের একটা হামিংবার্ড ছুটে গেলো সেই খালে, তার ছোট্ট ঠোঁটে পানি নিয়ে এসে ফেলেছিলো আগুনে, তারপর আবার ছুটে যাচ্ছিলো খালে, আবার পানি এনে আগুনে ফেলে দিচ্ছিলো। হামিংবার্ডের এই কাজ দেখে অন্য জন্তু-জানোয়ারগুলো অবাক! সবাই জানে সবচাইতে ছোট্ট পাখি এই হামিংবার্ড, তাই ওকে তাচ্ছিল্যভরে একজন জিজ্ঞেস করলো — “তুমি এটা কী করছো হামিং?”। ছোট পাখিটি উত্তর দিলো, “আমার সামর্থ্যে যতটুকু সম্ভব, আমি ততটুকুই করছি”।

আসলেই তো, আমার জীবনে আমি আমার যোগ্যতার কতখানি কী করেছি?

আমরা যদি পরিবর্তন চাই সমাজে, নিজেই হবো সেই পরিবর্তন, আমরা যদি সমাজকে সুন্দর করে চাই, নিজেই হবো সেই সুন্দর। আমরা অন্যদের কাছে নিজের জন্য যেমনটা চাই, আগে নিজেই সেই আচরণ করবো সবার সাথে।

  • আমাদের মাঝে যারা গান গাইতে পারে, তারা হয়ত সুন্দর, অনুপ্রেরণাময় গান গেয়ে উদ্বোধিত করতে পারে অন্য আরো অনেককে।
  • যারা সুন্দর করে কথা বলতে পারে, তারা সবাইকে ডাকবে সুন্দরের পথে তাদের কথা দিয়ে, বক্তব্য দিয়ে।
  • যারা অভিনয় করতে পারে, আঁকতে পারে, তারা সৃষ্টিশীলতায় ছড়িয়ে দিবে তাদের ভিতরের স্বপ্নগুলো।
  • যারা অন্যের সাথে মিশতে পারে, তারা ছুটে যাবে আরো শত-সহস্র মানুষের কাছে, ভাগাভাগি করে নিবে তাদের কষ্টগুলো, স্বপ্নগুলো ছড়িয়ে দিবে তাদের মাঝে।

কে বলেছে আমরা পারিনা? আমরা যদি অমন একশ প্রাণ আমাদের সামর্থ্যের সবটুকু নিংড়ে দিই, আমরা অবশ্যই আরো অন্তত একহাজার প্রাণকে উদ্বোধিত করতে পারবো, অনুপ্রেরণা দিতে পারবো, হাসি এনে দিতে পারবো তাদের মুখে। আমরা নতুন প্রজন্ম, আমরা নতুন প্রাণের শক্তি। আমরাই পারব ইনশাআল্লাহ। অতীতের ইতিহাস দেখলে আমরা দেখতে পাবো, এই পৃথিবীর বড় বড় পরিবর্তন সবসময় অল্প কিছু মানুষই এনেছে, তারা সবসময়েই মানুষ ছিলো, খুব সুন্দর, প্রাণোচ্ছ্বল, স্বপ্নবাজ আর কর্মঠ কিছু মানুষ!


আনুসঙ্গিক লিঙ্কঃ

অমল আহমেদ আলবাজের ইউটিউব ভিডিওঃ TEDxIB@YORK