শিক্ষার সাথে উত্তম আচরণের কোন সম্পর্ক আছে কি?

শিক্ষা আমাদের আচরণকে পরিশীলিত করে। এই কথা কতবারই তো শুনেছি। তোহ, আসলেই কি শিক্ষিতজনেরা পরিশীলিত ও সুন্দর আচরণের হয়ে থাকেন? কিংবা, যারা হন, তারা কেন হন? চিন্তা করে দেখলে বোঝা যায়, শিক্ষা মানেই পথ পাড়ি দেয়া। সে পথে আমাদের ইচ্ছেমতন না, একটা নিয়মতান্ত্রিক ছাঁচে পথ চলতে হয়। সেখানে একটা শৃংখলার মাঝে প্রতিষ্ঠানে উপস্থিত হতে হয়, সময় অনুযায়ী প্রস্তুতি নিয়ে পরীক্ষা দিতে হয়। এসবের মাঝে প্রকৃত শিক্ষা হয় শৃংখলার। কোথায় কেমন করে চলতে হয়, সেটার একটা অনুশীলন হয়। একটা বিষয়কে গভীরভাবে বিভিন্নভাবে চিন্তা করার দলবদ্ধ আয়োজন সেখানে থাকে। দলগতভাবে সমস্যা নিয়ে সামাজিকভাবে সম্পর্ক উন্নয়নের মাধ্যমে চিন্তাভাবনা করা হয় শিক্ষার্জনের সময়ে। সবার ব্যক্তিগত স্বপ্ন, দৃষ্টিভঙ্গি, চিন্তাভাবনার একটা প্রস্ফূটন হয় শিক্ষার মাধ্যমে। সবচেয়ে বড় কথা, নানান বয়সের, নানান পেশার, নানান পরিবারের, নানান মতবাদের মানুষদের সাথে নারী-পুরুষ ব্যতিরেকে মিথস্ক্রিয়া ও আচার-আচরণের একটি অনুশীলন হয় শিক্ষার্জনের সময়ে। এই সামাজিকতার শিক্ষা অনেক বড় শিক্ষা।

ব্যক্তির চিন্তাকে উদ্বোধিত করতে হলে, দৃষ্টিভঙ্গি ও আচরণকে পরিশীলিত করতে হলে মূলত শিক্ষার্থীর ইচ্ছা থাকতে হয়। কিন্তু যারা এসবের ধার না ধরে কেবল গ্রেড অর্জনের পড়াশোনা করে তারা তাদের মনের ক্ষুদ্রতাকে ছাপিয়ে চিন্তার ও অনুভূতির বিশালতাকে অর্জন করতে পারে না।

শিক্ষা অর্জন আমাদের দায়িত্ব। শিক্ষা অর্জন করতে হয় গুরু/ওস্তাদ/শিক্ষকের কাছে। তারা কেবল গুটিকতক পাঠই নয়, শেখান ব্যবহার, আচরণ, দায়িত্ববোধ, কর্তব্যপরায়ণতা। গোটা মানবজাতির শেকড় তো শিক্ষকদের হাতে, শিক্ষা ব্যবস্থার মাঝে। শিক্ষা ও শিক্ষালয়কে তাই গুরুত্বের সাথে নিয়ে তাদের উন্নয়নের চেষ্টা করা আমাদের জীবনের যেকোন সময়ে, যেকোন বয়সেই একটি বড় দায়িত্ব।

[১৪ মে, ২০১৫]

যারা দুঃখভারাক্রান্ত, তাদের জন্য লেখা….

… ​যারা দুঃখভারাক্রান্ত, তাদের জন্য লেখা….

আমরা যেসব বোকা মানুষ দুনিয়ার জীবনের বিভিন্ন বিপদাপদ, আশংকা-ভয়, দুঃখ-কষ্টে জর্জরিত হয়ে ভারাক্রান্ত হয়ে পড়ি, তাদের জন্য আল্লাহ নিজেই হচ্ছেন সবচেয়ে বড় এবং একমাত্র শান্তি, সমাধান। মনে রাখতে হবে, আমাদের জীবনের এই কষ্ট এসেছে আমাদেরকে ‘শুদ্ধ’ করতে এবং ‘মুক্ত’ করতে। আপনার মাঝে যদি ঈমান থেকে থাকে, তবে জেনে রাখবেন আল্লাহ এই পরীক্ষা হাজির করেছেন আপনাকে তার দিকে ফিরিয়ে নিয়ে আসতে। আল্লাহ আপনাকে আরো বেশি বেশি ইস্তিগফার ও আ’মাল করাতে চান। মু’মিনদের জীবনের যেকোন পরীক্ষাই আসে কল্যাণ হিসেবে, তাই অবশ্যই সবর করার চেষ্টা করতে হবে। এই কষ্টগুলো আপনার পাপগুলোকে পুড়িয়ে আপনাকে শুদ্ধ করবে যেমন করে সোনা পুড়ে খাঁটি হয়।

দুঃখভারাক্রান্ত অবস্থা থেকে উত্তরণের উপায় হিসেবে বেছে নিন নামাযে দাঁড়িয়ে থাকা, সিজদায় আল্লাহর কাছে বেশি বেশি কান্নাকাটি করার কাজকে; কেননা বান্দা আল্লাহর সবচেয়ে কাছে থাকে সিজদাকালীন সময়ে। শেষরাতে উঠে কান্নাকাটি করুন কেননা আল্লাহ রাতের শেষভাগে আমাদের নিকটবর্তী আসমানে নেমে আসেন যেন আমাদেরকে তিনি ক্ষমা করতে পারেন। রাতে তাহাজ্জুদে দাঁড়ানো মানে এমন না যে মাঝরাতে উঠে সারারাত নামাযে দাঁড়িয়ে থাকতে হবে। বরং, ফজরের ১০ মিনিট আগে উঠে কিছুক্ষণ সলাতে দাঁড়িয়ে কান্নাকাটি করে অনুভব করুন আপনার সাথে আল্লাহর সেই সম্পর্কটিকে যা কোনদিন হারাবে না। মনে রাখবেন, আপনার এখনকার জীবনের একমাত্র এই সম্পর্কটিই অবিনশ্বর, আর দুনিয়ার সবকিছুই হারিয়ে যায়, হারিয়ে যাবে, হারিয়ে গেছে।

আপনার নিজের বুকের ভালোলাগা ও ভালোবাসার আবেগটুকু দিয়ে গভীর মন দিয়ে কুরআন তিলাওয়াত করা যেতে পারে একথা স্মরণ রেখে যে এই কথাগুলো এই বিশ্বজগতের প্রতিপালক, যার কাছে আমরা ফিরে যাবো তিনি ঠিক আমার জন্যই পাঠিয়েছেন, এই গ্রন্থটিতে আছে আমার হিদায়াহ, আমার মুক্তি, আমার শান্তি, আমার চিরকালীন সুখ।

খুব দরকারি একটা টিপস হলো, পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম মানুষ, আপনাকে-আমাকে যিনি পৃথিবীর সবার চেয়ে বেশি ভালোবাসতেন সেই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জীবনী পড়া। তার সীমাহীন উঁচু মর্যাদা, সুন্দরতম আ’মাল সত্ত্বেও তাকে জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে যে কঠিন পরীক্ষা, দুঃখ-কষ্টের সম্মুখীন হতে হয়েছিলো তা আমাদের উপলব্ধিকেই বদলে দেবে।

হাতের কাছে রাখুন সাহাবা এবং সালাফদের জীবনীগুলো। বাজারে পাওয়া যায় ‘আসহাবে রাসূলের জীবনকথা’ সিরিজের বইগুলো, যা আপনাকে খুব অল্প কয়েক পাতায় দেখিয়ে দেবে শ্রেষ্ঠ প্রজন্মের মানুষদেরকে। তাদের জীবনকে উপলব্ধি করিয়ে আপনাকে দেখিয়ে দেবে সফলতার মঞ্জিলে যেতে হলে যে পথ পাড়ি দিতে হবে, তা খুব সহজ নয়, কিন্তু তার কষ্টগুলোর মাঝেও রয়েছে অন্যরকম এক প্রশান্তি কেননা এর মাধ্যমে যার কাছে যাওয়া যায় তিনি হলেন শান্তির মূল, তিনি হলেন ‘সালাম’।

বিপদগ্রস্ত, ঋণগ্রস্তদের জন্য রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের শেখানো খুব সুন্দর দু’আ আছে অনেকগুলো বিভিন্ন হাদিসগ্রন্থে। সহজে পেতে চাইলে পড়তে পারেন, ‘আযকারে মাসসূনাহ’ নামের বইটি থেকে যা ইমাম ইবনুল কাইয়্যিমের সংকলিত গ্রন্থ। সূরা বাকারাহতে (আয়াত ১৫৬) উল্লেখিত দু’আ “ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রজি’উন” পড়তে পারেন, সাইয়্যিদিনা ইউনুস আলাইহিস সালামের দু’আ হিসেবে পরিচিত “লা-ইলাহা ইল্লা আনতা সুবহানাকা ইন্নি কুন্তু মিনায যোয়ালিমিন”। অথবা পড়তে পারেন, “আল্লাহুম্মা ইন্নি আ’উদযুবিকা মিনাল হাম্মি ওয়াল হাযান, ওয়াল আজযি ওয়াল কাসলি ওয়াল বুখলি ওয়াল যুবনি ওয়া দলা’আদ দাইনি ওয়া গলাবাতির রিজাল”… এমন আরো অনেক দু’আ।

দু’আ একটি ইবাদাত, দু’আর মাধ্যমে আল্লাহর যিকির হয়, তাকে স্মরণ করা হয়, তার সর্বময় ক্ষমতার কাছে নিজেকে সোপর্দ করা হয়, আমাদের সৃষ্টির যে উদ্দেশ্য তা বাস্তবায়ন হয় যখন নিজেদেরকে মাটিতে লুটিয়ে আমরা আল্লাহর কাছে সিজদারত থাকি এবং চোখের পানি ঝরিয়ে দু’আ করতে থাকি। এক আলোচনায় শুনেছিলাম একজন ইমাম বলেছিলেন যে দুর্দশার সময়ে বান্দা আল্লাহর কাছে কান্নাকাটি করে তার কাছে চাওয়ার সময় এমন এক অনুভূতি পায় যা হলো ঈমানের অসাধারণ স্বাদ, সেটা হয় কারণ সে তখন আল্লাহ ছাড়া আর কারো শক্তির প্রতি আশা-আস্থা রাখে না। ফলে কেবলমাত্র ও কেবলমাত্র আল্লাহর স্মরণ করায় হৃদয়ের এই অনুভূতির স্বাদ সে হারাতে চায় না তাই সে চায় তার এই কষ্টকর সময়টা জারি থাকুক। সুবহানাল্লাহ!

আপনার, আমার যে দুর্দশাগ্রস্ত, বিপদগ্রস্ত সময় তা আসলে ‘কপাল’ নয়, তা আমাদের কর্মের বিনিময়ে আল্লাহর নিখুঁত পরিকল্পনা। জেনে রাখুন, আপনার জীবনে কী ঘটছে তিনি খুব ভালো করে জানেন এবং তিনি নিজেই তা ঘটাচ্ছেন। সুতরাং, জীবনে আসা পরীক্ষার সময়ে আপনি কীভাবে তার ‘রিপ্লাই’ দিচ্ছেন সে ব্যাপারে খুব সচেতন হোন।

এই দুনিয়ার জীবন তৈরি করা হয়েছে হৃদয়কে ভাঙ্গার জন্য। এখানে পরিপূর্ণ শান্তি চাওয়া কেবলই বোকামি। আল্লাহকে স্মরণ রেখে তার নির্দেশিত পথে চলার চেষ্টা করলে ইনশাআল্লাহ রব্বুল ‘আলামীন আমাদেরকে এই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হবার যোগ্যতা দেবেন এবং আখিরাতে উত্তম প্রতিদান দিবেন। নিশ্চয়ই যা দেখা যায় এবং যা দেখা যায় না (গাইব) সকল কিছুর জ্ঞান কেবলমাত্র তার এবং তিনিই আমাদের রব, আমরা সবাই তারই মুখাপেক্ষী, আর কারো নয়। আমরা সবাই তার কাছেই ফিরে যাবো, যেতেই হবে। আল্লাহ আমাদেরকে ক্ষমা করুন।

[লেখাটির বিষয়বস্তুর অনেকখানিই একাধিক স্কলারের আলোচনা থেকে শোনা। আল্লাহ তাদের উত্তম প্রতিদান দিন।]

@ রেফারেন্স : কিছু অসাধারণ ভিডিও

# Gratitude : A way of Life – Nouman Ali Khan : http://www.youtube.com/watch?v=FfvsOD3R0gE
# Never Lose Hope in Allah : Bilal Assad : http://www.youtube.com/watch?v=nxqoLEhjA6g
# Do Not Despair : Shaikh Mukhtar Ash-Shanqiti : http://www.youtube.com/watch?v=mo2bY0Y1lhQ
# Do Not Despir 2 : Shaikh Mukhtar Ash-Shanqiti : http://www.youtube.com/watch?v=eoJcnv4d7es
# Hope : Mukhtar Magraoui : http://www.youtube.com/watch?v=Mpz1M3hY_iU
# Dont’ Be Sad : Hamza Yusuf : https://www.youtube.com/watch?v=HqfP4ADWHEQ

কোন কিছু কি সহজ? আমরা কি কিছু করতে পারি?

কোন কিছু কি সহজ? আমরা কি কিছু করতে পারি? সবকিছুই তো কঠিন, যতক্ষণ না তিনি তা সহজ করে দেন, যতক্ষণ না তিনি আমার চারপাশকে একটা কাজের জন্য তৈরি করে দেন। আশেপাশের কতজন কী ভীষণ বদলে গেলো, সুন্দর থেকে সুন্দর মন-প্রাণের হয়ে গেলো। কেউ কেউ এত খারাপ হয়ে গেলো, সেই খারাপ কাজে মরেও গেলো। প্রায়ই ঘোরের মতন লাগে। এইতো সেদিন ছিলাম একসাথেই, একই আড্ডায়। আজ ছেলেগুলো নেই, আর কোনদিন পৃথিবীতে আসবে না। আমার নিজেরও অফিসে বের হবার সময় প্রায় প্রতিদিন সিঁড়ি বেয়ে নামার সময় মনে হয়, আজ কি বাসায় ফিরতে পারব দিনশেষে? আমরা তো ভীষণ দুর্বল সৃষ্টি। আমার দুর্বলতা আমি টের পেয়েছি যখন জ্বরে বিছানায় শুয়ে ঘোরে চলে গিয়েছি। অথবা অপারেশন থিয়েটারে ডাক্তারের সুঁই আর চাকুর নিচে গিয়ে মনে হয়েছিলো, আমার বিভ্রমের জীবনের সমাপ্তি কি তেমন কঠিন কিছু? যাদের চারপাশে বেঁধে রাখতাম, জুড়ে থাকতাম — সবাই তো দূরেরই।

কতই তো বদলে যেতে চাইলাম, কতখানিই বা পারি? তবে পরম আরাধ্য যা থাকে, তিনি সেই জিনিসগুলো সহজ করে দিতে থাকেন। পথপানে এগিয়ে গেলে সামনের পথ আলোকিত হয়ে দৃষ্টিসীমায় পথ প্রসারিত হতে থাকে। এই চাওয়া কতজনের কতরকম! যে যেমন জিনিসে মুগ্ধ হয়, ভালোবাসা কাজ করে যেদিকে, সে সেদিকেই ধাবমান হয়। ক্রমে তার প্রাপ্তিগুলোও ঐ কেন্দ্রিকই হয়। দুনিয়াতে ডুবে গেলে যাওয়াই হয়। আখিরাতের পথে কিছু চাইলে চাওয়ার গভীরতার উপরে হয়ত নির্ভর করে অর্জনের তীব্রতাও। তখন পথচলায় অনুভূতির জগতে কষ্টগুলোও হয়ত হালকা হয়ে যায়। সেটা তিনিই করে দেন। তিনিই তো সবকিছুর মালিক, যাকে ইচ্ছা দেন, যাকে ইচ্ছা বঞ্চিত করে কেড়ে নেন। মাঝে মাঝে দু’চোখে দেখে অসম্ভব লাগে আমার, আমি মুগ্ধ চোখে হয়ে বদলে যাওয়া অসাধারণ মানুষদের দেখি, হৃদয়ে নাড়া খাই। শুধু মনে হয়, এই পথযাত্রায় হয়ত থেমেই আছি, তবু তা হয়ত বসে থাকার চাইতে ভালো, জানিনা আমি। তিনি চাইলে সহজ হবে অনেক কিছুই, তার অপার রাহমাতের অপেক্ষাতেই রই। ফিরে তো যাব তার কাছেই, এসেছিলাম তার কাছ থেকেই। শাইখ হামজা ইউসুফের কথাটা স্মরণ হয়ে গেলো —

“আপনি যখন দরজায় দাঁড়িয়ে কড়া নাড়ছেন, তখন সেই কাজটিও দরজা খুলে যাওয়ার একটি অংশ; আপনি যখন কোন যাত্রাপথে তখন রওয়ানা হওয়ার মাঝেই আপনার যাত্রা শুরু হয়ে গেছে, যদি কাঙ্খিত লক্ষ্যে পৌঁছতে না-ও পারেন তবু চিন্তিত হবেন না। সময় নষ্ট করা বন্ধ করুন, মৃত্যু আপনার জন্য অপেক্ষা করছে। এটাই ছিলো ইমাম গাজ্জালীর মূল বার্তা।”

১০ এপ্রিল, ১৩