যারা দুঃখভারাক্রান্ত, তাদের জন্য লেখা….

… ​যারা দুঃখভারাক্রান্ত, তাদের জন্য লেখা….

আমরা যেসব বোকা মানুষ দুনিয়ার জীবনের বিভিন্ন বিপদাপদ, আশংকা-ভয়, দুঃখ-কষ্টে জর্জরিত হয়ে ভারাক্রান্ত হয়ে পড়ি, তাদের জন্য আল্লাহ নিজেই হচ্ছেন সবচেয়ে বড় এবং একমাত্র শান্তি, সমাধান। মনে রাখতে হবে, আমাদের জীবনের এই কষ্ট এসেছে আমাদেরকে ‘শুদ্ধ’ করতে এবং ‘মুক্ত’ করতে। আপনার মাঝে যদি ঈমান থেকে থাকে, তবে জেনে রাখবেন আল্লাহ এই পরীক্ষা হাজির করেছেন আপনাকে তার দিকে ফিরিয়ে নিয়ে আসতে। আল্লাহ আপনাকে আরো বেশি বেশি ইস্তিগফার ও আ’মাল করাতে চান। মু’মিনদের জীবনের যেকোন পরীক্ষাই আসে কল্যাণ হিসেবে, তাই অবশ্যই সবর করার চেষ্টা করতে হবে। এই কষ্টগুলো আপনার পাপগুলোকে পুড়িয়ে আপনাকে শুদ্ধ করবে যেমন করে সোনা পুড়ে খাঁটি হয়।

দুঃখভারাক্রান্ত অবস্থা থেকে উত্তরণের উপায় হিসেবে বেছে নিন নামাযে দাঁড়িয়ে থাকা, সিজদায় আল্লাহর কাছে বেশি বেশি কান্নাকাটি করার কাজকে; কেননা বান্দা আল্লাহর সবচেয়ে কাছে থাকে সিজদাকালীন সময়ে। শেষরাতে উঠে কান্নাকাটি করুন কেননা আল্লাহ রাতের শেষভাগে আমাদের নিকটবর্তী আসমানে নেমে আসেন যেন আমাদেরকে তিনি ক্ষমা করতে পারেন। রাতে তাহাজ্জুদে দাঁড়ানো মানে এমন না যে মাঝরাতে উঠে সারারাত নামাযে দাঁড়িয়ে থাকতে হবে। বরং, ফজরের ১০ মিনিট আগে উঠে কিছুক্ষণ সলাতে দাঁড়িয়ে কান্নাকাটি করে অনুভব করুন আপনার সাথে আল্লাহর সেই সম্পর্কটিকে যা কোনদিন হারাবে না। মনে রাখবেন, আপনার এখনকার জীবনের একমাত্র এই সম্পর্কটিই অবিনশ্বর, আর দুনিয়ার সবকিছুই হারিয়ে যায়, হারিয়ে যাবে, হারিয়ে গেছে।

আপনার নিজের বুকের ভালোলাগা ও ভালোবাসার আবেগটুকু দিয়ে গভীর মন দিয়ে কুরআন তিলাওয়াত করা যেতে পারে একথা স্মরণ রেখে যে এই কথাগুলো এই বিশ্বজগতের প্রতিপালক, যার কাছে আমরা ফিরে যাবো তিনি ঠিক আমার জন্যই পাঠিয়েছেন, এই গ্রন্থটিতে আছে আমার হিদায়াহ, আমার মুক্তি, আমার শান্তি, আমার চিরকালীন সুখ।

খুব দরকারি একটা টিপস হলো, পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম মানুষ, আপনাকে-আমাকে যিনি পৃথিবীর সবার চেয়ে বেশি ভালোবাসতেন সেই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জীবনী পড়া। তার সীমাহীন উঁচু মর্যাদা, সুন্দরতম আ’মাল সত্ত্বেও তাকে জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে যে কঠিন পরীক্ষা, দুঃখ-কষ্টের সম্মুখীন হতে হয়েছিলো তা আমাদের উপলব্ধিকেই বদলে দেবে।

হাতের কাছে রাখুন সাহাবা এবং সালাফদের জীবনীগুলো। বাজারে পাওয়া যায় ‘আসহাবে রাসূলের জীবনকথা’ সিরিজের বইগুলো, যা আপনাকে খুব অল্প কয়েক পাতায় দেখিয়ে দেবে শ্রেষ্ঠ প্রজন্মের মানুষদেরকে। তাদের জীবনকে উপলব্ধি করিয়ে আপনাকে দেখিয়ে দেবে সফলতার মঞ্জিলে যেতে হলে যে পথ পাড়ি দিতে হবে, তা খুব সহজ নয়, কিন্তু তার কষ্টগুলোর মাঝেও রয়েছে অন্যরকম এক প্রশান্তি কেননা এর মাধ্যমে যার কাছে যাওয়া যায় তিনি হলেন শান্তির মূল, তিনি হলেন ‘সালাম’।

বিপদগ্রস্ত, ঋণগ্রস্তদের জন্য রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের শেখানো খুব সুন্দর দু’আ আছে অনেকগুলো বিভিন্ন হাদিসগ্রন্থে। সহজে পেতে চাইলে পড়তে পারেন, ‘আযকারে মাসসূনাহ’ নামের বইটি থেকে যা ইমাম ইবনুল কাইয়্যিমের সংকলিত গ্রন্থ। সূরা বাকারাহতে (আয়াত ১৫৬) উল্লেখিত দু’আ “ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রজি’উন” পড়তে পারেন, সাইয়্যিদিনা ইউনুস আলাইহিস সালামের দু’আ হিসেবে পরিচিত “লা-ইলাহা ইল্লা আনতা সুবহানাকা ইন্নি কুন্তু মিনায যোয়ালিমিন”। অথবা পড়তে পারেন, “আল্লাহুম্মা ইন্নি আ’উদযুবিকা মিনাল হাম্মি ওয়াল হাযান, ওয়াল আজযি ওয়াল কাসলি ওয়াল বুখলি ওয়াল যুবনি ওয়া দলা’আদ দাইনি ওয়া গলাবাতির রিজাল”… এমন আরো অনেক দু’আ।

দু’আ একটি ইবাদাত, দু’আর মাধ্যমে আল্লাহর যিকির হয়, তাকে স্মরণ করা হয়, তার সর্বময় ক্ষমতার কাছে নিজেকে সোপর্দ করা হয়, আমাদের সৃষ্টির যে উদ্দেশ্য তা বাস্তবায়ন হয় যখন নিজেদেরকে মাটিতে লুটিয়ে আমরা আল্লাহর কাছে সিজদারত থাকি এবং চোখের পানি ঝরিয়ে দু’আ করতে থাকি। এক আলোচনায় শুনেছিলাম একজন ইমাম বলেছিলেন যে দুর্দশার সময়ে বান্দা আল্লাহর কাছে কান্নাকাটি করে তার কাছে চাওয়ার সময় এমন এক অনুভূতি পায় যা হলো ঈমানের অসাধারণ স্বাদ, সেটা হয় কারণ সে তখন আল্লাহ ছাড়া আর কারো শক্তির প্রতি আশা-আস্থা রাখে না। ফলে কেবলমাত্র ও কেবলমাত্র আল্লাহর স্মরণ করায় হৃদয়ের এই অনুভূতির স্বাদ সে হারাতে চায় না তাই সে চায় তার এই কষ্টকর সময়টা জারি থাকুক। সুবহানাল্লাহ!

আপনার, আমার যে দুর্দশাগ্রস্ত, বিপদগ্রস্ত সময় তা আসলে ‘কপাল’ নয়, তা আমাদের কর্মের বিনিময়ে আল্লাহর নিখুঁত পরিকল্পনা। জেনে রাখুন, আপনার জীবনে কী ঘটছে তিনি খুব ভালো করে জানেন এবং তিনি নিজেই তা ঘটাচ্ছেন। সুতরাং, জীবনে আসা পরীক্ষার সময়ে আপনি কীভাবে তার ‘রিপ্লাই’ দিচ্ছেন সে ব্যাপারে খুব সচেতন হোন।

এই দুনিয়ার জীবন তৈরি করা হয়েছে হৃদয়কে ভাঙ্গার জন্য। এখানে পরিপূর্ণ শান্তি চাওয়া কেবলই বোকামি। আল্লাহকে স্মরণ রেখে তার নির্দেশিত পথে চলার চেষ্টা করলে ইনশাআল্লাহ রব্বুল ‘আলামীন আমাদেরকে এই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হবার যোগ্যতা দেবেন এবং আখিরাতে উত্তম প্রতিদান দিবেন। নিশ্চয়ই যা দেখা যায় এবং যা দেখা যায় না (গাইব) সকল কিছুর জ্ঞান কেবলমাত্র তার এবং তিনিই আমাদের রব, আমরা সবাই তারই মুখাপেক্ষী, আর কারো নয়। আমরা সবাই তার কাছেই ফিরে যাবো, যেতেই হবে। আল্লাহ আমাদেরকে ক্ষমা করুন।

[লেখাটির বিষয়বস্তুর অনেকখানিই একাধিক স্কলারের আলোচনা থেকে শোনা। আল্লাহ তাদের উত্তম প্রতিদান দিন।]

@ রেফারেন্স : কিছু অসাধারণ ভিডিও

# Gratitude : A way of Life – Nouman Ali Khan : http://www.youtube.com/watch?v=FfvsOD3R0gE
# Never Lose Hope in Allah : Bilal Assad : http://www.youtube.com/watch?v=nxqoLEhjA6g
# Do Not Despair : Shaikh Mukhtar Ash-Shanqiti : http://www.youtube.com/watch?v=mo2bY0Y1lhQ
# Do Not Despir 2 : Shaikh Mukhtar Ash-Shanqiti : http://www.youtube.com/watch?v=eoJcnv4d7es
# Hope : Mukhtar Magraoui : http://www.youtube.com/watch?v=Mpz1M3hY_iU
# Dont’ Be Sad : Hamza Yusuf : https://www.youtube.com/watch?v=HqfP4ADWHEQ

জীবনে যা হয় তা আসলে কল্যাণময়

এক রাজার একজন কর্মচারি ছিলো যে সবসময় যেকোন অবস্থাতেই রাজাকে বলতো, “রাজা মশাই, কখনো মন খারাপ করবেন না কেননা আল্লাহ যা করেন সবকিছুই নিখুঁত ও সঠিক।”

একদিন তারা শিকারে বের হয় এবং এক হিংস্র প্রাণি তাদের আক্রমণ করে। রাজার কর্মচারীটি সেই প্রাণীকে মেরে ফেলতে সমর্থ হলেও রাজাকে তার একটি আঙ্গুল হারানো থেকে রক্ষা করতে পারেনি। কৃতজ্ঞ না হয়ে বরং ক্ষিপ্ত হয়ে রাজা তাকে বলে ওঠে, “আল্লাহ যদি ভালো হতেন তাহলে আমাকে এই আক্রমণে পড়ে আঙ্গুল হারাতে হতো না।”

সেই কর্মচারি উত্তর দিলো, “এতকিছুর পরেও আমি বলবো, আল্লাহ অত্যন্ত ভালো এবং তিনি যা করেন সবই নিখুঁত এবং কল্যাণময়।” এ কথায় অপমানিত হয়ে রাজা তার কর্মচারিকে গ্রেপ্তার করার নির্দেশ দেয়।

এরপর একদিন রাজা আবার শিকারে বের হন এবং একদল বন্য মানুষদের হাতে বন্দী হয় যারা মানুষকে বলী দিত। অন্যদিকে সেই বন্য মানুষরা দেখতে পেলো রাজার একটি আঙ্গুল নেই। তাই তারা রাজাকে ছেড়ে দিলো কেননা তারা বিশ্বাস করতো শারীরিক খুঁতসম্পন্ন কোন মানুষকে দেবতার উদ্দেশ্যে বলী দিলে তা গ্রহণ হয় না।

মুক্ত হয়ে প্রাসাদের ফেরার পথে রাজা সেই কর্মচারীটির মুক্তি ঘোষণা করে ডেকে এনে বলে, “বন্ধু, আল্লাহ আমার প্রতি সত্যি সদয় ছিলেন। আমি মৃত্যুর মুখোমুখি চলে গিয়েছিলাম কিন্তু আঙ্গুল হারানোর কারণে আমাকে ছেড়ে দেয়া হয়। কিন্তু আমার একটা প্রশ্ন আছে,  আল্লাহ যদি এতই ভালো হবেন, তাহলে তিনি কেন আমার দ্বারা তোমাকে কারাভোগ করতে দিলেন?”

কর্মচারী উত্তর দিলো, “রাজামশাই, আমি যদি আপনার সাথে যেতাম তাহলে তারা আমাকে বলী দিতো কেননা আমার কোন আঙ্গুলে ক্ষত নেই।  আল্লাহ যা করেন সবই নিপুণ এবং সঠিক, তিনি কখনো কোন ভুল করেন না।”

আমরা প্রায়ই জীবনের ব্যাপারে এবং জীবনে যেসব কষ্টকর বিষয়ের মুখোমুখি হই সেসব নিয়ে অভিযোগ করি। আমরা ভুলে যাই কোন কিছুই আপনাআপনি হয় না, বরং সবকিছুরই একটি নির্দিষ্ট কারণ রয়েছে।  আল্লাহই ভালো জানেন তিনি কেন এই কথাগুলো আপনাকে পড়ার সুযোগ করে দিলেন আজকে, তাই অনুগ্রহ করে এই মেসেজটি মানুষের কাছে পৌঁছে তাদের প্রতি দয়া করুন।

সবকিছুই নির্দিষ্ট কোন কারণে ঘটে, সবকিছুর একটি উদ্দেশ্য আছে এবং তা আমাদের কল্যাণের জন্যই। নিশ্চয়ই আল্লাহ মহান, আল্লাহু আকবার!

(লেখাটি শাইখ যাহির মাহমুদের পেইজ থেকে সংগৃহীত ও অনূদিত)
* * * *

[২৯ আগস্ট, ২০১৩]

আমাদের মনের জানালা দিয়ে দেখা

একটা গল্প, কিছু কথা, বলে দেয় অনেক কিছুই…
…..

নববিবাহিত দম্পতি নতুন বাসা নিয়েছে। পরদিন সকালে তারা যখন নাশতা করছিলো, মেয়েটি জানালা দিয়ে পাশের বাড়ির দিকে তাকিয়ে দেখতে পেলো কাপড় শুকাতে দিয়েছে ঘরের কর্ত্রী। সে বলে উঠলো,
– ‘কাপড়টা পরিষ্কার হয়নি, ঐ বাসার মহিলা ভালো করে কাপড় ধুতে জানেনা। তার মনে হয় ভালো কোন কাপড় কাচার সাবান দরকার।” মেয়েটির স্বামী সেদিকে তাকালো, কিন্তু নিশ্চুপ রইলো।

যতবারই পাশের বাড়ির মহিলাটি কাপড় শুকাতে দিতো, ততবারই এই মেয়েটি একই মন্তব্য করতো।

মাসখানেক পরে সেই বাড়িতে সুন্দর পরিষ্কার কাপড় শুকানোর জন্য ঝুলতে দেখে মেয়েটি অবাক হয়ে তার স্বামীকে বললো,”দেখো, অবশেষে উনি শিখেছেন কীভাবে ঠিকভাবে কাপড় ধুতে হয়। আমি তো ভাবছি কে তাকে শেখালো!!”
তখন ছেলেটি বলে উঠলো, “শোনো, আজ ভোরে আমি আমাদের জানালার কাঁচ পরিষ্কার করেছি!”

…..

আমাদের জীবনটাও এমনই —

“আমরা কোন কিছু দেখার সময় যা দেখি তা নির্ভর করে আমাদের সেই জানালার পরিচ্ছন্নতার উপর যা দিয়ে আমরা দেখি। কোন সমালোচনা করার আগে আমাদের নিজের মনের অবস্থাটা খেয়াল করে নেয়া প্রয়োজন, নিজেদেরকে প্রশ্ন করা দরকার যে আমরা কি তার মাঝে কোন ভালো দেখতে চাই আদৌ? নাকি মানুষটার দিকে তাকাচ্ছি তার ভুলগুলো খুঁজে পেতে বিচার করবো বলেই।”

সবাই তো পড়লাম… আসুন তা নিজেদেরকে স্মরণ করিয়ে দিই।

[শাইখ যাহির মাহমুদের ফেসবুক পেইজের পোস্ট থেকে ভাষান্তর]

যদি কিছু ভালো না লাগে, অস্থির লাগে তাহলে কিছু আইডিয়া

কিছু কিছু সময় আছে যখন ‘কেন যেন ভালো লাগতেসেনা’ টাইপের ফিলিং হয়। বয়ঃসন্ধিকালে যখন এরকম হতো, তখন বইপত্র ঘেঁটে এইটার কারণ উদঘাটন করতে গিয়ে পড়ে নিজেকে বুঝ দিয়েছিলাম যে এখন আসলে শরীর-মনে পরিবর্তন আসছে তাই একটু মন খারাপ/উদাস হতেই পারে। সমস্যা সমাধান হয়নি, বরং সময়ের সাথে সাথে প্রকট হয়েছিলো। ভার্সিটি লাইফে উপলব্ধি করলাম হল জীবনটা হলো সুতোকাটা ঘুড়ির মতন, এখানে ‘কী যেন নেই’ অনুভূতি আরো বেড়ে গিয়েছিলো। আশেপাশে সবাইকে দেখে টের পেতাম, এরকম অনুভূতিকে খুব কম ছেলেই আলাদা ধরতে পারত, কিন্তু পালিয়ে বাঁচতে তাস খেলা, কম্পিউটার গেমস, মুভি দেখা টাইপের অর্থহীন সময় নষ্টের কাজের মাঝেই ‘এন্টারটেইনমেন্ট’ খুঁজে নিতো, কিন্তু কখনই অন্তরের শূণ্যতা দূর করতে পারত না কেউ। মনের সাথে সামনে দাঁড়িয়ে বোঝাপড়া করার সাহসটাই বেশিরভাগ মানুষের থাকে না, মনকে তখন ‘চিন্তা এড়িয়ে’ যেতে দেয় সবাই। সমস্যার সমাধান তখন আর হয়না ।

সমাধান নিয়ে ভেবেছিলাম তখনো। ইদানিং বেশ কিছু আলোচনা আর বই আল্লাহ সামনে এনে দিয়েছেন যা থেকে শিখছি, মূল সমাধান আসলে খুবই সরল — জীবনের কেন্দ্রে আল্লাহকে নিয়ে আসা, প্রতিটা কাজেই আল্লাহর সন্তুষ্টি খোঁজা। যখন ছোট ছোট কাজেও আমরা আল্লাহর সাহায্য চাই এবং তা করে আল্লাহকে খুশি করতে চাই তখন তা সহজ করে দেন আল্লাহ। কিন্তু সমস্যা হলো, আমরা সবসময় চাইনা, ভুলে যাই বা বিষয়টিতে আনন্দ পাইনা বলে আগ্রহ একরকম থাকে না সবসময়। আমাদের মন খুবই পরিবর্তনশীল, দু’আ করা উচিত — ‘ইয়া মুক্বাল্লিবাল কুলুব, সাব্বিত কুলুবানা ‘আলা দ্বীনিক’।

আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনকে কেন্দ্রে রেখে জীবনের কাজগুলো করতে চাইলে কিছু চেষ্টা করতে হবে। প্রথমত, জানা দরকার যে এমনটা হবেই, দুনিয়াতে অন্তর কখনো পূর্ণ হবেনা, শূণ্যতা থাকবেই। কেবলমাত্র যেদিন আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার সাক্ষাত লাভ করবে রূহ, সেদিন আমরা প্রশান্ত হব, শান্তি পাবো। দ্বিতীয়ত, অন্তরকে সঠিক পথে ধরে রাখতে কিছু ছোট ছোট কাজ করা যেতে পারে —

# অনর্থক কথা বলা, অন্যের গীবত করায় কোন কল্যাণ নেই। এইসব কথাবার্তা এড়িয়ে চলা উচিত। কল্যাণকর কথা বলা, সম্ভব হলে জ্ঞানী ও দ্বীনি বন্ধু/ভাইদের সান্নিধ্য খোঁজা। না থাকলে নির্জনতায় জ্ঞানার্জনের জন্য বইকে সঙ্গী করার চেষ্টা করা।

# সবসময় অযুর মধ্যে থাকা। একবার অযু ভেঙ্গে গেলে, আবার অযু করা। এতে পবিত্র ভাব থাকে, শরীর-মন চনমনে থাকে, ইবাদাতের প্রতি একটা স্বতঃস্ফূর্ত আকাঙ্ক্ষা আসে।

# সুন্দর, পরিচ্ছন্ন পোশাক পরা, নিজেকেও পরিপাটি করে রাখা। নিজের ‘ড্রেস-আপ এবং টার্ন-আউট’ অনেক প্রভাব ফেলে মানসিকতায়।

# গান না শোনাঃ একজন দ্বীনদার মুসলিম বাদ্যযন্ত্র সহকারে তৈরি হওয়া প্রচলিত নষ্টধারার গান শুনবে না এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু তবুও কখনো এরকম ভুল যেন না হয়। গানের কথাগুলো বেশিরভাগেই প্রেম-বিরহ এবং শিরক বিষয়ে হয়ে থাকে, যা শুনলেও তা পথভ্রষ্ট করে উদাস করবে, নইলে মনকে সুরের মূর্ছনায় নিয়ে মনকে শূণ্যতা থেকে ক্ষতিগ্রস্ত হবার মত কোন পথে নিয়ে যাবে, ইবাদাতের প্রতি ভালোবাসাকে কমিয়ে ফেলবে।

# কুরআন তিলাওয়াত করাঃ কুরআন তিলাওয়াত করা অন্তরকে প্রশান্ত করে। যেকোন অশান্তিকে দূর করে। জীবনের প্রকৃত লক্ষ্যকে স্মরণ করিয়ে দেয়। আল্লাহর গ্রন্থের এই এক অসাধারণ গুণ, সুবহানাল্লাহ!

# সলাত আদায় করাঃ দুই রাকা’আত সলাত আদায় করলেও মন প্রশান্ত ও কেন্দ্রীভূত হয়ে যাবার কথা। নামাযের সিজদার সময় বান্দা আল্লাহর সবচাইতে নিকটবর্তী হয়। এই সময়টা পেলে অন্তরও প্রশান্ত হবেই ইনশাআল্লাহ। মুসলিম হিসেবে সলাত আমাদের জন্য চক্ষুশীতল করা শান্তি এনে দেবে — এটা তো আমাদের ঐতিহ্য।

♥ সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ, মনে রাখতে হবে কোন অবস্থাতেই বিষণ্ণতাকে প্রশ্রয় দেয়া যাবে না। মনটাকে সবসময় কাজ দিতে হবে। ভালো লাগা পছন্দের কাজে (যা কল্যাণকর) যত ছোটই হোক তা করা উচিত, এতে মন প্রফুল্ল থাকে। যেকোন নেতিবাচক চিন্তা আমাদের সৃষ্টিশীলতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে, সম্ভাবনাকে নষ্ট করে, ঈমানকেও ক্ষতিগ্রস্ত করে। ইতিবাচক চিন্তা করতে হবে, সম্ভাবনা নিয়ে ভাবতা হবে। বিভিন্ন বিষয় থেকে ভালো খুঁজে নিতে হবে, মন্দটুকু নিয়ে চিন্তা ও আলাপ করা ক্ষতি ছাড়া আর কিছুই বয়ে আনে না। ♥

আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা যেন আমাদেরকে প্রচেষ্টাগুলোকে কবুল করেন, আমাদেরকে ‘নাফসুল মুতমাইন্নাহ’ বা প্রশান্ত আত্মাকে ধারণ করার তাওফিক দেন এবং আমাদেরকে জান্নাতুল ফিরদাউসের পথে পরিচালিত করেন। আমিন।


রেফারেন্স

# লা তাহযান, হতাশ হবেন না – ড আইদ আল কারনি (peace পাবলিকেশন্স, মূল্য ২৪০ টাকা, প্রাপ্তিস্থান: কাঁটাবন মসজিদ কমপ্লেক্স)
# ভিডিও লেকচার : শাইখ হামজা ইউসুফ

হামিংবার্ড ও আমরা

একটা বনে আগুন লেগেছে। সমস্ত বন তোলপাড়, সব প্রাণিরা এসে ভীড় করেছে আগুণের চারপাশে। সবাই হা-হুতাশ করছে এখন কী হবে ভেবে। সেই বনের পাশে একটা খাল ছিলো। বনের একটা হামিংবার্ড ছুটে গেলো সেই খালে, তার ছোট্ট ঠোঁটে পানি নিয়ে এসে ফেলেছিলো আগুনে, তারপর আবার ছুটে যাচ্ছিলো খালে, আবার পানি এনে আগুনে ফেলে দিচ্ছিলো। হামিংবার্ডের এই কাজ দেখে অন্য জন্তু-জানোয়ারগুলো অবাক! সবাই জানে সবচাইতে ছোট্ট পাখি এই হামিংবার্ড, তাই ওকে তাচ্ছিল্যভরে একজন জিজ্ঞেস করলো — “তুমি এটা কী করছো হামিং?”। ছোট পাখিটি উত্তর দিলো, “আমার সামর্থ্যে যতটুকু সম্ভব, আমি ততটুকুই করছি”।

আসলেই তো, আমার জীবনে আমি আমার যোগ্যতার কতখানি কী করেছি?

আমরা যদি পরিবর্তন চাই সমাজে, নিজেই হবো সেই পরিবর্তন, আমরা যদি সমাজকে সুন্দর করে চাই, নিজেই হবো সেই সুন্দর। আমরা অন্যদের কাছে নিজের জন্য যেমনটা চাই, আগে নিজেই সেই আচরণ করবো সবার সাথে।

  • আমাদের মাঝে যারা গান গাইতে পারে, তারা হয়ত সুন্দর, অনুপ্রেরণাময় গান গেয়ে উদ্বোধিত করতে পারে অন্য আরো অনেককে।
  • যারা সুন্দর করে কথা বলতে পারে, তারা সবাইকে ডাকবে সুন্দরের পথে তাদের কথা দিয়ে, বক্তব্য দিয়ে।
  • যারা অভিনয় করতে পারে, আঁকতে পারে, তারা সৃষ্টিশীলতায় ছড়িয়ে দিবে তাদের ভিতরের স্বপ্নগুলো।
  • যারা অন্যের সাথে মিশতে পারে, তারা ছুটে যাবে আরো শত-সহস্র মানুষের কাছে, ভাগাভাগি করে নিবে তাদের কষ্টগুলো, স্বপ্নগুলো ছড়িয়ে দিবে তাদের মাঝে।

কে বলেছে আমরা পারিনা? আমরা যদি অমন একশ প্রাণ আমাদের সামর্থ্যের সবটুকু নিংড়ে দিই, আমরা অবশ্যই আরো অন্তত একহাজার প্রাণকে উদ্বোধিত করতে পারবো, অনুপ্রেরণা দিতে পারবো, হাসি এনে দিতে পারবো তাদের মুখে। আমরা নতুন প্রজন্ম, আমরা নতুন প্রাণের শক্তি। আমরাই পারব ইনশাআল্লাহ। অতীতের ইতিহাস দেখলে আমরা দেখতে পাবো, এই পৃথিবীর বড় বড় পরিবর্তন সবসময় অল্প কিছু মানুষই এনেছে, তারা সবসময়েই মানুষ ছিলো, খুব সুন্দর, প্রাণোচ্ছ্বল, স্বপ্নবাজ আর কর্মঠ কিছু মানুষ!


আনুসঙ্গিক লিঙ্কঃ

অমল আহমেদ আলবাজের ইউটিউব ভিডিওঃ TEDxIB@YORK