বিদায় ২০১৫ : পাওলো কোয়েলহো

goodbye2015
​​বিদায় ২০১৫

সবাইকে জানতে হয় কখন কোনো একটা পর্যায় শেষ হয়। যতটুকু প্রয়োজন, তার চেয়ে বেশি সময় তাকে থাকার জন্য যদি আমরা জোর খাটাই, আমরা শান্তি হারিয়ে ফেলবো। আরো হারাবো সেই পর্যায়টির মধ্য দিয়ে যাওয়ার কারণে যা শেখা যায় সে ব্যাপারগুলোকেও।

কোনো একটি পর্যায়ের শেষ, দরজা বন্ধ হওয়া, অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি — যে নামটিই আমরা দেই না কেন, যা গুরুত্বপূর্ণ তা হলো জীবনের যে মূহুর্তগুলো শেষ হয়ে গেলো, তাদের ছেড়ে দেয়া।

আপনি কি চাকরিটা হারিয়েছেন? ভালোবাসার সম্পর্কটি শেষ হয়ে গেছে? বাবা-মায়ের বাড়িটি ছেড়ে আসতে হয়েছে? দেশ ছেড়ে প্রবাসে গিয়েছেন? দীর্ঘকাল ধরে চলা বন্ধুত্বের সম্পর্কটি হঠাৎ শেষ হয়ে গেছে? 

আপনি দীর্ঘ সময় কাটিয়ে দিতে পারবেন কেন এমনটা হলো তা ভাবতে ভাবতে। 

আপনি নিজেকে নিজে বলতেই পারেন– যে জিনিসটি আপনার জীবনে এতটা দৃঢ়ভাবে ছিলো, এতটা গুরুত্বপূর্ণ ছিলো তা হঠাৎ করে কেন এমন করে ধূলিস্মাত হয়ে গেলো তার কারণ উদঘাটন না করে আপনি আর একটি পদক্ষেপও দিবেন না সামনের দিকে।

কিন্তু এমন আচরণ আপনার সাথে জড়িয়ে থাকা সবগুলো মানুষকে তীব্র কষ্টের মাঝে রাখবে – আপনার বাবা-মা, আপনার স্বামী কিংবা স্ত্রী, আপনার ভাই-বোন, সন্তান, বন্ধুদের।

সবাই তাদের নিজ অধ্যায়গুলো শেষ করে চলেছে, নতুন পাতা উল্টেছে, জীবনে সবাই যখন এগিয়ে চলেছে তখন আপনাকে স্থির দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলে সবার খারাপ লাগবে।

সবকিছুই পেরিয়ে যায়। সবচেয়ে  ভালো যে কাজটি আপনি করতে পারেন তা হলো সত্যিকারভাবে পার হয়ে যেতে দিন।

সে কারণেই যে কাজটি সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ (যত কষ্টেরই হোক না কেন) তা হলো স্মৃতিগুলো ধ্বংস করে ফেলা। এগিয়ে চলুন, এতিমদের অনেক কিছু দান করুন, আপনার কাছে থাকা বইগুলো বিক্রি করুন নয়ত উপহার দিয়ে দিন।

আপনি যা কিছু দেখতে পান, তার সবকিছুই অদৃশ্য জগতের একটা স্পষ্ট প্রতিচ্ছবি– তাই কিছু স্মৃতিদের হাত থেকে নিজেকে মুক্তি দেয়া মানে অন্যান্য স্মৃতিদের সেখানে কিছু জায়গা করে দেয়া।

যা কিছু যাবার যেতে দিন। মুক্তি দেন সেগুলোকে। নিজেকে তাদের থেকে দূরে সরিয়ে নিন। জীবনকে কেউ কখনো স্পষ্ট করে বুঝতে পারে না; তাই আমরা কখনো জয়ী হই এবং কখনো হেরে যাই।

কোন কিছুর বিনিময় চেয়ে কাজ করবেন না, আশা করবেন না আপনার কাজগুলো প্রশংসিত হবে। তেমনি আশা করবেন না আপনার প্রতিভার স্ফূরণ হবে, আপনার ভালোবাসা কেউ বুঝতে পারবে।

আপনার আবেগের টেলিভিশনে একই অনুষ্ঠান একটানা বারবার করে দেখা বন্ধ করুন যেখানে আপনি দেখতে পান কেমন করে আপনার একটা ক্ষত হয়েছিলো আর তাতে আপনি কতটাই না ভুগেছেন– এমন ব্যাপার তো আপনাকে শুধুই বিষাক্ত করে চলেছে, আর কিছুই নয়।

আপনার ভালোবাসার যে সম্পর্কটি ভেঙ্গে গেছে, তাকে গ্রহণ করতে না পারার মতন ভয়ংকর ব্যাপার তো আর নেই। তেমনই ভয়ংকর হলো এমন কাজ যার কোন শুরু হবার তারিখ নেই, এমন সিদ্ধান্ত যা সবসময় ‘উপযুক্ত মূহুর্তটির’ জন্য ঝুলিয়ে রাখা হয়।

একটা নতুন অধ্যায় শুরু করার আগে আগেরটা শেষ হতে হয়। নিজেকে বলুন যে যা চলে গেছে তা আর ফিরে আসবে না। নিজেকে সেই সময়টার কথা মনে করিয়ে দিন যখন আপনি সেই মানুষটি কিংবা সেই জিনিসগুলো ছাড়াই আপনি বেঁচে থাকতে পারতেন — কোনো কিছুই তো অপূরণীয় নয়। একটা অভ্যাস তো আর অভাব নয়। হয়ত কথাটি বেশি সরল শোনাচ্ছে, হয়ত ব্যাপারটি খুব বেশি কঠিন, কিন্তু এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

কিছু চক্র বন্ধ হয়। তা কোন অহংকার, অযোগ্যতা, দম্ভের জন্য নয় বরং স্রেফ তা আপনাকে সাথে আর যায় না। দরজা বন্ধ করুন, স্মৃতিখাতাকে বদলে ফেলুন, ঘরদোর পরিষ্কার করুন, ধুলোবালি ঝেড়ে ফেলুন।

আপনি যা ছিলেন তা থেকে বদলে আপনি প্রকৃতপক্ষে যা , সেটিই হয়ে যান।

—– পাওলো কোয়েলহো

আপনার হৃদয় কি ভারাক্রান্ত?

আপনার হৃদয় কি ভারাক্রান্ত? কষ্টে-যন্ত্রণায়, অপ্রাপ্তি-অশান্তি, শঙ্কায়-অস্থিরতায় কাটাচ্ছেন? একটা ব্যাপার জানেন? পৃথিবীতে এই মূহুর্তে কোটি কোটি মানুষ আপনার চেয়েও ভয়ংকর কষ্টে সময় কাটাচ্ছে। আপনি কি ভেবে দেখেছেন, আপনার এই মূহুর্তটা কিন্তু বেশিদিন থাকবে না!

কষ্টের একটা সময় থাকে। প্রথম ধাক্কাটা কিছুটা তীব্র হয়। কিছু বিষয়ে আবার পরবর্তীতে কষ্টটায় দীর্ঘ সময় ধরে ভুগতে হয়। সেগুলো যেমনই হোক, মানুষ অভ্যস্ত হয়ে যায়। সন্তানকে কবরে রেখে এসে পিতাকে বের হতে হয় জীবিকার সন্ধানে। সন্তান আর স্বামী মরে যাওয়ার পরেও একজন নারী ফিরে এসে রান্নার যোগাড় করেন অন্তত খেয়ে বেঁচে থাকতে। জীবন এমনই। আপনি যে কষ্টটিকে সহ্যের অতিরিক্ত ভাবছেন, যে ক্ষতিটাকে কল্পনাতীত ভেবে আপনার বুক ফেটে যাচ্ছে — সেটুকুকেই আঁকড়ে ধরে বেঁচে থাকার প্রেরণা পেতেন আরো অসংখ্য লোক। তারা সেটুকুও পান না।

[০৩ ডিসেম্বর, ২০১৫]

কোন কিছু নিয়ে এতো চিন্তা করে কী হবে?

 

নিজেকে দয়া করুন, নিজের প্রতি রহমদীল হোন। কোন কিছু নিয়ে এতো চিন্তা করে কী হবে? প্রতিটা মানুষের জীবনের স্রোত আলাদা, একের সাথে আরেকটা মিশে না। অন্যের সাথে তুলনা করতে যাবেন না। এমনকি নিজের অতীতের সাথেও না। শুধু জেনে নিন, আপনার জীবনে সামনে যা আসে, তা আল্লাহর পাঠানো। কিছুতেই তা এড়িয়ে যেতে পারতেন না। গ্রহণ করে নিন জীবনে যা কিছু আসে, আসবে। হাসিমুখ থাকুন, চিন্তাক্লিষ্ট হয়ে দুশ্চিন্তা ও আশংকা করে নিজেকে নষ্ট করবেন না।

আমাদের উপরে যা কিছু আসে তা আমাদের সাধ্যের অতিরিক্ত নয়, এ আল্লাহর স্পষ্ট ঘোষণা। আস্থা রাখুন নিজের উপরে। দুর্যোগ মানেই জীবন ধ্বংস নয়, হোক তা প্রাকৃতিক কিংবা মানবসৃষ্ট। দুর্যোগ কেটে যায়। ধ্বংসস্তূপ সারিয়ে তুলতে হয় সেই আপনাকেই। তাই, অপেক্ষা করুন নতুন করে গড়ে নেয়ার। এটাই জীবন। অতিকাব্যিক কিছু নেই পৃথিবীর জীবনে। আসল সফলতা আল্লাহর কাছে। দুনিয়ায় কাজ হলো সুন্দর করে মূহুর্তগুলোতে আপনার দায়িত্ব পালন করে যাওয়া। ফলাফল আল্লাহর হাতে। সবই আল্লাহর হাতে।

সহজভাবে গ্রহণ করুন জীবন। হাসিমুখ থাকুন, হাসিমুখ তৈরি করুন। কাজ করুন। মন দিয়ে কাজ করুন। কাজের মাঝে বেঁচে থাকুন যেন এগুলো সাদকায়ে জারিয়া হয়ে মরণের পরেও বন্ধু হয়ে রয়।

কেউ দেখে শিখে আর কেউ ঠেকে শিখে

জীবনে সবাই শেখে। কেউ কেউ শেখার জন্য বেছে নেয় খুব কষ্টের পথ। আপনি যে জিনিস হয়ত মধ্য বয়সে শিখছেন, তা হয়ত অনেকে কৈশোরে শিখে ফেলেছে। কেউ হয়ত স্কুল জীবনে যা শেখার কথা, আজো তা শেখেনি। এগুলো চিন্তা করে অবাক হবেন, তাতে লাভ নেই। আসল বিষয় হলো, আপনি কখন শিখবেন। যখনই হোক, জীবনে যখন “ঠেকে শিখবেন” তখনই আল্লাহর কাছে কৃতজ্ঞ হতে হয়। প্রকৃতপক্ষে, যতই শিখবেন, শেখার সময়টা অবশ্যই কষ্টের, কিন্তু না শেখা জীবন হতাশা আর গ্লানির। যারা কখনই শেখে না, বুঝেও বুঝে না, দেখেও অনুভব করে না–তারা আজীবন বুকের জ্বালায় দগ্ধ হয়ে মরে। কষ্টের উৎস খুঁজে না পাওয়ার যে জ্বালা, সেটা তারা হাড়ে হাড়ে উপলব্ধি করে।

কেউ ক্লাসরুমে আনন্দ করে শেখে, কেউ শেখে শুভাকাংখীর উপদেশ থেকে। আবার নির্মম শিক্ষা হলো খুব বড় ক্ষতি থেকে শেখা। তবুও, শেখা শেখাই। একটা কথা বহুল প্রচলিত, “শিখেছি কোথায়? ঠেকেছি যেথায়”। তাই শেখায় কোন লজ্জা নেই, বয়স নেই। ঐ যে বলে না? ‘better late than never’– দেরিতে হলেও শিখুন। শেখাই জীবন। শিখলেই জীবন বদলায়। কিন্তু শেখার পথটা খুব কষ্টের। খুব। যে কোন চিন্তা, অভিজ্ঞতা আমাদের যা শেখায়, তা একটা দুর্গম পথ। কিন্তু, শেখা ছাড়া জীবন হয় না। ‘পড়ো, তোমার প্রভুর নামে, যিনি তোমায় সৃষ্টি করেছেন,’ — শেখার এক পরম আদেশ, হালাল-হারাম, অমুক-তমুক, ইত্যাদি চিন্তা করার আগেই শিখতে দৌড়াতে হবে।

যারা সাধারণ বাক্যই উপলব্ধি করতে পারে না, চোখের সামনে, নিজের জীবনে শত-সহস্র ঘটনা থেকেও শিখতে পারে না। ধর্মের কথা, হালাল-হারাম আর পাপ-পুণ্যের গল্প বলে সে তো কেবল অন্যের ক্ষতিই করবে। আল্লাহ তো দিন-রাত্রির পরিবর্তনে, আকাশ আর দুনিয়ার সৃষ্টির মাঝে তাকিয়ে থেকে চিন্তাশীলদের শেখার আমন্ত্রণ দিয়েছেন। কয়টা হৃদয় সত্যিকারের শিখতে পারি? এই আকাশ আর পৃথিবী, রাত আর দিনে কী কী শিখেছি তা পয়েন্ট করে লিখে নিজেরাই লজ্জায় পড়ে যাবো না?

শিখতে হবে। একদম শিশুদের মতন শেখা। শেখাতেই রয়েছে মুক্তির শুরু। শেখার মাঝেই রয়েছে কারাগার থেকে মুক্ত হওয়ার চাবি। সবাই আটকে পড়ে আছি কারাগারে। অজ্ঞতা, অন্ধত্ব, অহং, হিংসার কারাগার। আলো দাও খোদা। ‘নূরুন আলা নূর’ কবে একটানা হতেই থাকবে আমাদের হৃদয়ে?

[১৩ নভেম্বর, ২০১৫]

মানুষ হিসেবে ভুল করার অধিকার আপনার আছে

মানুষ হিসেবে ভুল করার অধিকার আপনার আছে। আপনি প্রতিদিনই ভুল করবেন, সেগুলো থেকে উত্তরণই আপনার প্রতিদিনের সফলতা। আপনার ভুলকে পুঁজি করে কেউ আহত করলে, আঘাত দিলেই কিন্তু আপনি ভেংগে পড়বেন না। আপনাকে সম্পূর্ণ ভুল মানুষ হিসেবে কেউ দাবী করলে তাতে কষ্ট পাবেন না। কেননা, আপনি এই মানুষটা একদিনে হননি।

আপনার গোটা জীবনের প্রতিটি দিনের ছোট ছোট সৌন্দর্য মিলেই এই আপনি। আল্লাহর পৃথিবী একদিনে উলটে যায় না। কারো কথায়, আচরণে আহত হবেন না। শক্ত হোন, নিজের কাছে সততা রাখুন। আল্লাহ ঠিক জানেন আপনার অন্তরের সৌন্দর্য, অন্যদের প্রতি আপনার ভালোবাসা, শুভকামনা আর দোয়া– আপনি সবকিছুর বিনিময় অবশ্যই পাবেন। আপনার সংগোপনে করা সুন্দর চিন্তাগুলোর প্রতিবিম্ব আপনি খুঁজে পাবেন অন্য মানুষের আচরণে, কথায়।

আল্লাহর পৃথিবীটা অনন্য সুন্দর। এখানে সবকিছু মিলেই সবকিছু। অল্পতেই আশাহত হবেন না। 🙂

[১৩ নভেম্বর, ২০১৫]

আপনি কি নিজের ভেতরের জিঞ্জিরগুলো চুরমার করতে পেরেছেন?

 

আচ্ছা, আপনি কি কখনো নিজের ভেতরের সমস্ত জিঞ্জিরগুলো ভেঙ্গে চুরমার করতে পেরেছেন? আপনি কি সমস্ত খারাপলাগা, কষ্ট, ক্লেদ, ঘৃণা, হিংসা, অপ্রাপ্তির হিসেব, অস্বস্তি, অশান্তিকে ভেঙ্গে নিজেকে ফুরফুরে হাসি উপহার দিতে পেরেছেন? পেরেছেন নিজেকে ভালোবাসতে? নিজেকে যে ভালোবাসতে পারে না, সে অন্যদেরকেও পারে না। যে নিজের একাকীত্বকে সহ্য করতে পারেনা, সে অন্যের সান্নিধ্যেও শান্তি পায় না। যে নিজের কারাগারে নিজে বন্দী থাকে, সে অপর কারো সান্নিধ্যে আরো বেশি বন্দীত্ব অনুভব করে।

খেয়াল রাখুন যেন নিজের চারপাশের শেকলগুলো আপনাকে বেঁধে না রাখে, যেন অতীতের মতন গ্লানিময় না হয় আগামীর দিনগুলো। হাসুন মন খুলে, বৃষ্টিকে উপভোগ করুন আনন্দে। আপনার মতন জীবন তো পৃথিবীতে কোটি-কোটি মানুষ এখনো উপভোগ করছে– সাগ্রহে কিংবা বাধ্য হয়ে। আপনি যা পাচ্ছেন, সে তো আল্লাহর একান্ত দান। তিনি যা দিচ্ছেন, তা আপনার জন্যই নির্ধারিত। তিনি যা থেকে আপনাকে বঞ্চিত করছেন, তা আপনি কিছুতেই পেতেন না। এই বর্তমানের মূহুর্তটুকু উপভোগ করুন। প্রাণের, অনুভূতির, উপলব্ধির এই মহামূল্যবান সময়ের জন্য কৃতজ্ঞতা অনুভব করুন। আপনার চারপাশেই অনেক মানুষ চিন্তা ও উপলব্ধির সময় কিংবা সুযোগটুকুও পাচ্ছেন না। কীসের জ্বালা আপনাকে ভারাক্রান্ত করছে বলুন তো?

ভেবে দেখুন, এই মূহুর্তটির মতন মূল্যবান কিন্তু কিছু আপনার জীবনে নেই। এই এক্ষুনি বুকের মাঝে আনন্দের ঢেউ খেলাতে পারবেন কি? না পারলে চিন্তিত হয়ে দেখুন তো, কোন নষ্ট অনুভূতির বাঁধ আপনার ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতার স্রোতকে আটকে দিচ্ছে? সমস্ত শান্তি ও ভালোবাসার ভান্ডারের চাবি তো আমাদের হৃদয়ের গহীনেই, কেন তবু আমরা দুঃখিত, বিষণ্ণ, অশান্ত?

[৬ অক্টোবর, ২০১৫]

সুখে থাকার খুব সহজ একটা তরিকা

পৃথিবীতে সুখে থাকার খুব সহজ একটা তরিকা আছে। স্রেফ বর্তমানে থাকুন। এটা একদমই কঠিন কোন বিষয় না। সুখী হতে হলে আপনাকে অনেক কিছু করে দুনিয়া উলটে দিতে হবে না। স্রেফ বর্তমানের মাঝে জীবনকে ধারণ করুন। বর্তমানকে খুব গভীরভাবে দেখুন, বর্তমানকে নিয়ে বেঁচে থাকুন, বর্তমানের মূহুর্তগুলোকে উপভোগ করুন।

অতীতের কারণে অনুশোচনা ও দুশ্চিন্তা আর ভবিষ্যত নিয়ে যত বেশি উদ্বেগ ও শংকা করবেন, আপনি তত বেশি অশান্তিতে থাকবেন। অতীত আর ভবিষ্যত নিয়ে দুশ্চিন্তা করে মূলত আপনি অন্য কারো/অন্য কিছুর কাছে নিজের স্বস্তি/শান্তি/সুখ জমা দিয়ে দিলেন।

যা হবার হবেই। যা হয়েছে, তা হবারই ছিলো। কিছুই পরিবর্তনের ক্ষমতা, যোগ্যতা আপনার ছিলো না, থাকবেও না। আপনি বর্তমানটুকুকে সুন্দর করুন, যেন এটুকু নিয়ে আপনার আফসোস করতে না হয়। যে কোন সুন্দর, আনন্দময়, পাপহীন, ফলদায়ক সময় আপনাকে জীবনে শক্তি ও স্বস্তি এনে দেবে। তাই বর্তমানকে গড়ুন। বর্তমানকে সুন্দর করুন। কেবল আজকের দিনটিতে সুন্দর করে বাঁচুন।

গ্রহণ করে নিন জীবনে যা ঘটেছে। গ্রহণ করে নিন এই ভেবে যে এর চেয়েও খুব খারাপ কিছু ঘটলেও আপনার কিছু করার ছিলো না। জীবনকে আপনি যতটা মেনে নিতে পারবেন, আপনি ততটাই সুখী হবেন। আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞ থাকুন, জীবনকে নিয়ে প্রশান্ত থাকুন, আনন্দিত থাকুন, মন দিয়ে কাজ করুন। সুখী হবেন। দুনিয়াতে ও আখিরাতে — উভয় স্থানেই কল্যাণ পাবেন। তাই, বর্তমানে মনোযোগ দিন, এই মূহুর্তটিতেই মন দিন। সুখী হোন।

# চিন্তার উদ্দীপনা: https://www.youtube.com/watch?v=Qy5A8dVYU3k

[০৬ নভেম্বর, ২০১৫]

অদ্ভুত সুন্দর অনুপ্রেরণার গল্প : ডুবন্ত জাহাজ ও বেঁচে যাওয়া নাবিক

​একবার একটি যাত্রীবাহী জাহাজ ঝড়ের কবলে পড়ে ভেঙ্গে টুকরো টুকরো হয়ে গেলো। ঝড়ের তোড়ে সবাই হারিয়ে গেলেও মাত্র একজন লোক বেঁচে গেলো। জ্ঞান ফিরে পাবার পর লোকটি নিজেকে একটি নির্জন দ্বীপের আবিস্কার করলো। প্রতিটা মূহুর্ত সে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করতে লাগলো যেন কেউ এসে তাকে উদ্ধার করে। তার প্রার্থনা এক সময় হতাশায় পরিণত হলো; কেউ এলো না তাকে উদ্ধার করতে। সে উদ্ধার পাওয়ার আশা ছেড়ে দিয়ে শেষতক নিজেকে দ্বীপটির সাথে মানিয়ে নিলো।

এভাবে কয়েক মাস পেরিয়ে গেলো। লোকটি এর মধ্যে নির্জন দ্বীপটিতে যুদ্ধ করে টিকে থাকা শিখে গেছে। খিদে লাগলে সে মাছ ধরে, ছোট প্রানী শিকার করে কিংবা ফলমূল দিয়ে আহার করে। শক্ত লতাপাতা, খড়কুটো এবং বড় গাছের গুড়ি দিয়ে সে একটি কুড়েঘর ও বানিয়ে ফেললো।

একদিন লোকটি খাবারের সন্ধানে বের হলো। সন্ধ্যার দিকে কিছু পাখি ধরে আনার পর সেগুলো আগুনে ঝলসাতে বসলো কিন্তু অসাবধানতাবশতঃ কুঁড়েঘরে আগুন লেগে গেলো। কুঁড়েঘরটি সমুদ্র তীর থেকে কিছুটা দূরে ছিলো, তাই সে পানি ব্যবহার করতে পারলো না এবং অন্য কোনোভাবেই আগুন নেভাতে পারলো না। মোটা কাঠের গুড়ি দাউ দাউ করে জ্বলতে লাগলো। লোকটির এতদিনকার সব পরিশ্রম চোখের সামনে ভস্মীভূত হতে দেখে লোক টি প্রচন্ড রাগ এবং ক্ষোভে সৃষ্টিকর্তার উদ্দেশ্যে দুই হাত উচু করে চিৎকার করতে লাগলো-

“হে খোদা, আমার সাথে এমন কেন করলে? আমি দিনের পর দিন তোমার কাছে প্রার্থনা করেছি যেন আমাকে কেউ উদ্ধার করে নিয়ে যায়, কিন্তু কেউ আসেনি। এখন তুমি আমার শেষ সম্বলটাও আগুনে জ্বালিয়ে দিলে। কেন এমন করলে আমার সাথে?”

এরপর লোকটি বালুতে হাঁটু গেড়ে কাঁদতে শুরু করলো। এভাবে কিছুক্ষণ কেটে যাওয়ার পর লোকটি জাহাজের ভেঁপু শুনে অবাক হয়ে লক্ষ্য করলো একটি জাহাজ এদিকেই আসছে। জাহাজ থেকে লোক নেমে এসে লোকটিকে উদ্ধার করার পর লোকটি ক্যাপ্টেনের কাছে তাকে কিভাবে খুঁজে পেলো জানতে চাইলো।
ক্যাপ্টেন উত্তর দিলেন, আমরা দ্বীপের অপর পাশ দিয়ে যাচ্ছিলাম। হঠাত এদিকে আগুনের শিখা দেখে ভাবলাম কেউ উদ্ধার পাবার জন্য আগুন জ্বালিয়েছে। তাই জাহাজ ঘুরিয়ে এদিকে আসতেই আপনাকে পেয়ে গেলাম।

…………….

আমাদের জীবনেও এমন একের পর এক সমস্যা আর বিপদ এসে আমাদেরকে বিপর্যস্ত করে ফেলে। কিন্তু আল্লাহ এই খারাপ সময় এবং সমস্যাগুলোতে যে পরবর্তীতে আমাদের কল্যাণ সাধন করার জন্যই দেন এটা আমরা উপলব্ধি করতে পারিনা।

তাই বিপদে বা সমস্যায় পড়লে আল্লাহকে ভুলে না গিয়ে তার প্রতি বিশ্বাস রাখুন। বিশ্বাস রাখুন, যা কিছু হয়েছে তা কল্যাণকর হয়েছে। ইনশাআল্লাহ যা কিছু হবে, তা ভালো হবে। নিশ্চয়ই মু’মিনদের জীবনের বিপদ-আপদ ও কষ্ট-যন্ত্রণা সবই কল্যাণকর।

[গল্পটি ইন্টারনেট থেকে সংগৃহীত ও সম্পাদিত]

অনুপ্রেরণা – ৭

[কথাগুলো বিভিন্ন অনলাইন উৎস থেকে সংগৃহীত ও অনূদিত]

​* * *
​আপনার জীবনের সুখ আপনার চিন্তার সৌন্দর্যের সাথে গভীরভাবে সম্পর্কিত। উত্তম, সুন্দর ও ইতিবাচক চিন্তা করুন।

* * *
কৃতজ্ঞতা আরো বেশি প্রাপ্তির সম্ভাবনা নিশ্চিত করে। জীবনে যা পেয়েছেন, তা নিয়ে সন্তুষ্ট থাকুন। সেগুলো না পেলেও আপনার কিছু করার ছিলো না।

* * *
অন্ধকারে ডুবে গেলে আলোর মর্ম বুঝি আমরা। কঠিন সময়ের মুখোমুখি হলে টের পাই আমরা কতটা শান্তিতে ছিলাম। সবসময় কৃতজ্ঞ থাকা উচিত।


* * *
আমরা কখনো বন্ধু হারাই না। আমরা শিখি সত্যিকারের বন্ধু কে ছিলো….

* * *
বাস্তবতা হলো– আল্লাহ দেখেন আমাদের অন্তরের অবস্থা, নিয়াত। দুনিয়ার মানুষ দেখে কোন কাজে আমাদের উপস্থাপনা, কীভাবে করি সেটা।

* * *
আল্লাহ আপনার জন্য যা নির্ধারিত রেখেছিলেন, শুধু তা-ই হয়েছে। এটা কোনভাবেই অন্যকিছু হবার কথা ছিল না।

* * *
জ্ঞানীদের আত্মবিশ্বাস কল্যাণময়,  মূর্খদের আত্মবিশ্বাস ভয়ংকর বিপজ্জনক।

* * *
সবাই একটা ভুল কাজ করছে বলেই সেটা ঠিক কাজ হয়ে যাবে না। বেশিরভাগ লোক অন্যদের দেখাদেখি ভুল পথেই হাঁটে।

* * *
আল্লাহ আপনাকে পছন্দ করেন বলেই আপনি নামাজে দাঁড়াতে পারেন,  তাকে স্মরণ করতে পারেন।
* * *

আমাদের ঘরগুলো যত বড়ই হোক না কেন, আমাদের কবরের দৈর্ঘ্য নির্দিষ্ট। 

ঐ পারেতে সর্বসুখ বোকাদের বিশ্বাস

এক বনে এক কাক বাস করতো।
কাকটি তার জীবন নিয়ে খুবই সন্তুষ্ট ছিল। কিন্তু একদিন সে একটি রাজহাঁস দেখতে পেল…
কিন্তু কথায় আছে, “নদীর এ পার কহে ছাড়িয়া নিঃশ্বাস, ও পারেতে সর্বসুখ আমার বিশ্বাস।” কাকটি ভাবলো, আহা! রাজহাঁস কতই না সুন্দর!  নিশ্চয়ই সে এই পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী পাখি। কাকটি তার এই ভাবনার কথা রাজহাঁসকে জানালো।

রাজহাঁস জবাব দিলো, “আসলে, আমি ভাবতাম আমিই বুঝি এখানকার সবচেয়ে সুখী পাখি যতক্ষণ না আমি একটি টিয়াকে দেখলাম… টিয়ার গায়ে আছে দু’ধরনের রং। তাই এখন আমি মনে করি, টিয়াই হলো সৃষ্টির মাঝে সবচেয়ে সুখী পাখি।”

কাক এরপর গেল টিয়ার কাছে। টিয়া তাকে বললো, “আমি ছিলাম খুব খুব সুখী, যতক্ষণ না আমি ময়ূরকে দেখতে পেলাম…… আমার গায়ে তো মাত্র দু’টি রং, আর ময়ূরের শরীরে কত বর্ণেরই না সমাহার!”

কাক এরপর চিড়িয়াখানায় গেল ময়ূরের সাথে দেখা করতে। সেখানে সে দেখতে পেল, ময়ূরকে দেখতে শত শত মানুষ ভিড় জমিয়েছে।  সবাই চলে যাওয়ার পর, কাক ময়ূরের কাছে গেল–
“ও ময়ূর, তুমি দেখতে কতই না সুন্দর! তোমাকে দেখতে প্রতিদিন হাজারো মানুষ ভিড় জমায়। আর আমি? আমাকে দেখলেই মানুষ দূর দূর করে তাড়িয়ে দেয়। তুমি নিশ্চয়ই জগতের সবচেয়ে সুখী পাখি।”

ময়ূর জবাব দিলো,
“আমিও ভাবতাম, আমিই বোধহয় এই গ্রহের সবচেয়ে সুন্দর এবং সুখী পাখি। কিন্তু এই সৌন্দর্যের কারণে আমাকে খাঁচায় বন্দি করে রাখা হয়েছে। আমি এই চিড়িয়াখানা খুব ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করেছি এবং বুঝতে পেরেছি কাকই হচ্ছে একমাত্র পাখি যাকে কখনোই খাঁচায় বন্দি করা হয় না।তাই গত ক’দিন যাবত আমি ভাবছি, ইশ! আমি যদি কাক হতাম, তাহলে যেখানে খুশি ঘুরে বেড়াতে পারতাম।”

………………..
এটাই হলো আমাদের সমস্যা।
আমরা অহেতুক অন্যদের সাথে নিজেদের তুলনা করি আর দুঃখ পাই।
আল্লাহ আমাদের যা দিয়েছেন,আমরা তার কোন গুরুত্ব দিই না। এভাবে আমরা সকলেই দুঃখের দুষ্টচক্রে পড়ে ঘুরপাক খেতে থাকি।

তাই স্রষ্টা আপনাকে যা দিয়েছেন, তার গুরুত্ব দিয়ে, সুখী হওয়ার গোপন রহস্যটা বুঝতে শিখুন আর অহেতুক অন্যদের সাথে তুলনায় নিয়ে নিজে অসুখী হওয়াকে দূরে ছুড়ে ফেলুন।

* * * * * * *
শাইখ যাহির মাহমুদের অফিসিয়াল ফেসবুক পেজ থেকে সংগৃহীত।
অনুবাদ কৃতজ্ঞতা: ইমরান হেলাল]